আমি হেগ গ্রুপ এবং সেই এমন সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শুরু করব, যারা এই কংগ্রেস আয়োজনের জন্য নিরলস কাজ করেছেন।আমি জানি এই ধরনের আয়োজন করা কতখানি কঠিন এবং এখানে উপস্থিত হয়ে ও এতে অংশগ্রহণ করতে পেরে আমি গর্বিত। এছাড়াও, আমিআমার সহ অতিথিদেরও ধন্যবাদ জানাতে চাই, যাদের সাথে বিভিন্ন কথোপকথনের মাধ্যমে আজ আমি ইতিমধ্যেই অনেক কিছু জেনেছি। আমিজানি যে, এখানে কথা বলার তুলনায় শোনা ও শেখার জন্যই মূলত আমার আসা এবং তাই আমি আমার বক্তব্যও সংক্ষেপেই বলব।
1984 সালে, ডাবলিন সুপারমার্কেটের এক দোকানী, মেরি ম্যানিং নামের এক তরুণী বর্ণবৈষম্য নীতির অধীনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনাআঙুর বিক্রির কাজ করতে অস্বীকার করেন। এই প্রত্যাখ্যানের ফলস্বরূপ, তাকে কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলে সে তার ইউনিয়নের অন্যান্যসদস্যদেরও সাথে ধর্মঘটে বসে। তাদের ধর্মঘট প্রায় তিন বছর চলে এবং অবশেষে আইরিশ সরকার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা ফল ওশাকসবজির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়।
বর্ণবৈষম্যের পতন কি ইউরোপের কর্মীদের উদ্যোগের কারণে ঘটেছিল? অবশ্যই না। মুক্তির সংগ্রাম দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষরাই লড়ে জিতেছিল।কিন্তু আমরা জানি, এই বর্ণবৈষম্য নীতির অবলম্বন করা রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ এই সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।দক্ষিণ আফ্রিকার লোকজনের সংহতিতে সাড়া দিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নিছক দর্শকের ভূমিকা পালন করেননি, বরং এই মুক্তিআন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন।
বর্ণবৈষম্যের অন্যায়কে নিন্দা করে নিঃসন্দেহে অনেক সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই সেই ধর্মঘটী শ্রমিকদের সাহসী উদ্যোগের তুলনায় আজও বড় হয়ে উঠতে পারেনি। 2021 সালে, যখন আমি ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশন আন্দোলনে যোগ দেওয়ারসিদ্ধান্ত দেরিতে হলেও নিয়েছিলেম, তখন আমার তাদের উদাহরণই মনে ছিল, আমি তখন বর্ণবৈষম্যের পক্ষে থাকা ইসরায়েলের সংস্থার সাথেকাজ করতে অস্বীকার করি। মেরি ম্যানিং ও তার সহকর্মীরা তাদের কাজের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আমিও আমার সীমিতসামর্থ্যে একই কাজ করতে চেয়েছিলাম।
আমাকে আর আলাদা করে বলার দরকার নেই যে, ফিলিস্তিনের জীবন ও সংস্কৃতির ওপর কীরকম পদ্ধতিগত ধ্বংসীকরণ আমরা গত কয়েক বছরেইতিমধ্যেই চাক্ষুষ করেছি এবং তা স্থায়ীভাবে আমাদের বিশ্বের ইতিহাস পালটে দিয়েছে। আমাদের অনেকেরই মনে হয়েছে যে, প্রকাশ্য গনহত্যারনৈতিকতার সামনে আমাদের বাক্যস্ফূর্তির স্থান আর নেই। মনে হয় তখন শুধুই ভয়াবহতার চিৎকার করতে পারি, যে চিৎকার শুরু হবে কিন্তু শেষহবে না। মাঝে মাঝে, নিজের মনে ভাবি, এই চিৎকারই হয়ত কথা ও বক্তৃতার থেকে বেশি কার্যকর হবে। তবে এই কংগ্রেসের একটি শিক্ষা হল, এমনকি যদিও আমাদের কিছু করার না থাকে, তখনও কিছু না কিছু করার সুযোগ থাকে।
ফিলিস্তিনের মুক্তিযুদ্ধ ফিলিস্তিনের লোকেরা লড়ছে এবং তারা পরিশেষে জিতবে। তবে সপ্তাহের শেষে আমরা যে প্রশ্নটি আলোচনা করেছি, তা হলআন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—এখানে আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলতে শুধু দেশ বা রাষ্ট্র নয়, বরং ট্রেড ইউনিয়ন, নাগরিক সমাজ, প্রতিবাদী গোষ্ঠী—এমনকি সাধারণ লোকজনের কথা বলছি—তারা কীভাবে গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং ফিলিস্তিনের মুক্তির পথে সমর্থন করতে পারে।
হেগ গ্রুপ আমাদের সেই কাজের একটি মডেল ও মিলনস্থল দিয়েছে। ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো সাম্রাজ্যবাদী ও শিল্প সংগঠনগুলোশক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু আমরা জানি তাদেরও ধ্বংস করা সম্ভব। আমাদের একসাথে অবশ্যই এই গণহত্যার পদ্ধতি পরিচালনাকারী শক্তিরদুর্বল জায়গা খুঁজে বের করতে হবে এবং তাতে চাপ সৃষ্টি করতে হবে—আইনানুগ পদক্ষেপ, শিল্পক্ষেত্রে ধর্মঘট, মিডিয়ার মাধ্যমে, ভোক্তা বয়কট, প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ এবং এরকম আরও অনেক কিছুর মাধ্যমে।
ফিলিস্তিনের সংগ্রাম সর্বদা মানুষের মুক্তিযুদ্ধ এবং এই বিশ্বের ভবিষ্যৎ সংগ্রাম ছিল এবং তা থাকবেও। ফিলিস্তিনের সংহতি আন্দোলনের বিরুদ্ধেযাদের দাঁড়াতে দেখি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সঙ্গী ক্লায়েন্ট দেশগুলো, যার মধ্যে শুধু ইসরায়েল নয়, বরং ইউরোপেরও অনেক অংশ রয়েছে; সামরিক-শিল্প আঁতাত; জীবাশ্ম জ্বালানী কেনাবেচা; কর্পোরেট ও আর্থিক ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি ইত্যাদিও এগুলোর মধ্যে রয়েছে—এগুলো সেই একইশক্তি, যেগুলো আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে এবং আমাদের বেঁচে থাকার মৌলিক ভিত্তি ধ্বংস করে চলেছে। ফিলিস্তিনের সংহতিরপক্ষে দাঁড়িয়ে, আমরা আসলে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার যুদ্ধ কীভাবে করতে হয়, তা শিখছি।
এই সপ্তাহান্তে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেক প্রতিনিধিকেই তাদের কাজের জন্য গুরুতর ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশোধের সম্মুখীন হতেহয়েছে। এবং আমি আমাদের সেই সহকর্মী, বিশেষত যারা বৈশ্বিক দক্ষিণে এবং বিশেষত আমাদের ফিলিস্তিনের কমরেডদের ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা ক্রমাগত আইনি নিপীড়ন, হয়রানি ও রাষ্ট্রীয় হিংসার মুখেও অবিচল থেকেছেন। আমরা জানি, প্রতিরোধ কতটা কার্যকর তা বোঝা যায়প্রতিরোধমূলক সরকারি দমননীতির মাত্রার ভিত্তিতে। এবং আমরা জানি এই আন্দোলনের অনেক নায়ক তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য কারাগারে বন্দিহয়েছেন। তবে আজ যারা এখানে ভাগ্যক্রমে উপস্থিত থাকতে পেরেছি, বিশেষত যারা ফিলিস্তিনের নয়, তাদের কাছে সর্বদা কিছু না কিছু করারসুযোগ থাকে।
ধনী বৈশ্বিক নর্থের অনেক শিল্পী, লেখক ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এখন আরও বেশি করে গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, এমনকি তারাপ্রতিবাদী ক্যাম্পেইন ও আনুষ্ঠানিক বয়কটেও সামিল হচ্ছেন। এই ধরনের বিশিষ্ট জনের অন্যতম একজন হিসাবে আমি জানি, আমাকে প্রায়ইশুনতে হয় যে ফিলিস্তিনের সংহতির পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আমাকে কী মূল্য চোকাতে হয়েছে। কিন্তু যখন দেখি অন্যান্যরা এই সংগ্রামের জন্য কী কীত্যাগ স্বীকার করেছেন, তখন আমার মনে হয় এই প্রশ্নটাই ভুল। আমি জানি এই কথা বলার ফলে আমাকে গণমাধ্যমে অপ্রিয় হয়ে উঠতে হতেপারে, এমনকি আইনি ঝামেলাও পোহাতে হতে পারে। কিন্তু আমি আমার সহকর্মী লেখক ও শিল্পীদের জিজ্ঞাসা করতে চাই, যদি আমরা কী হারাতেপারি সেই বিষয়ে বেশি নজর না দিই, তাহলে গল্পটার অন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকটা ভালো করে দেখতে পাব।
নিজেদের থেকেও বৃহত্তর কোনো স্বার্থে নিজেদের জড়াতে, মানবমুক্তির সংগ্রামে সামান্য হলেও অংশ নেওয়া, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে না থাকার প্রয়াস - এমন অন্ধকার সময়ে আর কী আমাদের জীবনকে সহনীয় করে তুলতে পারে? এমন আতঙ্কের মুখে আর কী আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিতে পারে, হতাশাকে ঠেকাতে পারে, একসঙ্গে শান্তিতে থাকতে সাহায্য করতে পারে এবং পরিণাম যাই হোক না কেন আমাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করার সাহস দিতে পারে? আমাদের মধ্যে যারা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে বাস করছি এবং যারা জনসমক্ষে কথা বলার অসাধারণ সুযোগ ও সুবিধা পেয়েছি—এটি কোনো মূল্য চোকানোর প্রশ্ন নয়। বরং ঠিক তার উল্টো। আমাদের উচিত স্পষ্টভাবে দেখা এবং প্রকাশ করা যে ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের জীবনের গৌরব।
