৯ জুন, আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত আটজন নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবাননের টায়ার শহর খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। টায়ার শহরটি আলেকজেন্ডার দ্যা গ্রেট এবং রোমান সাম্রাজ্যের যুগ অতিক্রম করে এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রায় ৪,০০০ বছর টিকে ছিলো। এখন ইসরায়েল চাইছে এটি সম্পূর্ণ খালি করতে— প্রাচীন শহর এবং চার্চ এবং ১৯৪৮ সালে জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত ফিলিস্তিনি পরিবার যেখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করছে সেই সব শরনার্থী শিবির।
কিছুদিন পর ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ জোর দিয়ে বলেন যে ইসরায়েলের দিকে ছোঁড়া লেবাননের প্রতিটি রকেটের জবাবে বৈরুতের দাহিয়া জেলা, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস করে সেখানকার ১০টি করে ভবন মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হবে। তিনি ইতিপূর্বে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে দাহিয়া শীঘ্রই দেখতে গাজার খান ইউনিসের মত হয়ে যাবে এবং দক্ষিণের গ্রামগুলোকে রাফাহ এবং বেইত হানুনের মত গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।
গাজায় যারা ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছেন তারা লেবাননেও একই নিধন আভিযান চালানো হচ্ছে দেখে নিশ্চয়ই অবাক হবেন না, কিন্তু এমন নয় যে কোন কিছু প্রত্যাশিত হলেই তা কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে— আর এখন যেহেতু ইসরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা শোনা যাচ্ছে, ইসরায়েল যা করেছে এবং এখনও প্রতিবেশীর প্রতি কী করার পরিকল্পনা করছে তা যাচাই করা প্রয়োজন—এর সাথে, মনে হচ্ছে, লেবানন সরকারের নীরব সম্মতি রয়েছে।
মার্চ থেকে এই পর্যন্ত ৪,২০০ এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১০,০০০ এর উপর। লেবাননের জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৬৪টি হসপিটাল এবং ক্লিনিক, এবং ১০০ এর বেশি স্বাস্থকর্মী নিহত হয়েছেন। এপ্রিল ৮, ইসরায়েলি হামলা প্রায় ১০ মিনিটে ১০০ এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, নিহত হয়েছেন ৩৫৭ জন, গৃহযুদ্ধের পর লেবাননের এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন।
গণহত্যা বিষয়ক সনদের জন্য মৃতদেহের সংখ্যা অথবা বিশেষ ধরণের অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। পরিকল্পিত গণহত্যার জন্য প্রয়োজন একটি জনগোষ্ঠিকে সম্পূর্ণ অথবা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সংকল্প এবং সেই ধ্বংস ডেকে আনার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিত জীবনযাত্রার পরিবেশ। একটি জনগোষ্ঠীর মানুষ হাজারে হাজারে নিহত হয় না, এক পঞ্চমাংশ মানুষ তাদের নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়, এবং তাদের হাসপাতাল, তাদের পানির ব্যবস্থা, তাদের কৃষিজমিও ধ্বংসের শিকার হয় এমন এক রাষ্ট্রের হাতে যার মন্ত্রীরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি এর ঘোষণাও দেন, শুধু সেই বিশেষ উদ্দেশ্যের নাম বাদ দিয়ে অন্য যে কোনও কারণ দেখিয়ে । ইসরায়েলের “গ্রেটার মিডল ইস্ট” ধারণায় সমৃদ্ধি বলতে স্পষ্টত সবই বোঝানো হয় কেবল মানুষকে বাদ দিয়ে যারা এই অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেঃ কৃষক, ডাক্তার, কবি, শিশু, গ্রাম, ফলের বাগান, ইতিহাস এবং বাড়িঘর যেগুলো শুরুতেই ধ্বংস করতে হয় যেন ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিজের জয়গান গাইতে পারে। তাই দক্ষিণ লেবাননের প্রতি আমদের দায়বদ্ধতা রয়েছে যেন আমরা তার উপর চালানো গণহত্যা প্রচেষ্টার সাক্ষী হই, যদিও বর্ণনা করার মত তার এখনও কিছু বাকি আছে।
এখন ইসরায়েল এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই ভূখণ্ডে তাদের ধ্বংসলীলা আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়— লেবানন সরকারের সহায়তায়। ২৬ জুন, ওয়াশিংটনে লেবানন এবং ইসরায়েল ১৪ দফার একটি রূপরেখা চুক্তি সাক্ষর করেছে যা নীরবে দক্ষিণকে দখলদারিত্বের হাতে সঁপে দিয়েছে। চুক্তিতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের জন্য প্রতিরোধ বাহিনীর নিরস্তীকরণের শর্ত দেয়া হয়েছে, যা ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আর্টিকেল ১৩ লেবাননকে “আন্তর্জাতিক অথবা আইনি অঙ্গনে [ইসরায়েলের বিরুদ্ধে] সব ধরনের শত্রুতামূলক অথবা প্রতিকূল পদক্ষেপ” বন্ধ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ করে, এটি এমন একটি ধারা যা ইসরায়েলকে মার্কেট এবং রাস্তায় সাধারণ মানুষের উপর পেজার আক্রমণ, হাসপাতালের ধ্বংস, চিকিৎসাকর্মী এবং সাংবাদিকদের উপর হামলা এবং অন্য সব নির্বিচার হত্যার দায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেয়। ইসরায়েল, গাজাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছে “ইয়োলো লাইন” এর ওপারে ৪০ শতাংশেরও কম ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে, এখন একই কৌশল প্রয়োগ করেছে লেবাননের উপর, “সিকিউরিটি বাফার” প্রতিষ্ঠার নামে ভূখণ্ডের এক বিশাল অঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। বিমান হামলা এবং শ্বেত ফসফরাস যার সূচনা করেছিলো এখন ইসরায়েল এভাবেই তা সম্পূর্ণ করার পরিকল্পনা করেছে। গাজায় যা ক্যান্সার হিসেবে শুরু হয়েছিলো তা আরও ছড়িয়ে পড়েছে—উত্তরে দখলদারিত্বের বিস্তার, শান্তির আবরণে আত্মসমর্পনের শর্ত, লেবাননের প্রতি একই ধরণের শান্তি প্রস্তাব, তাদেরকে বাদ দিয়েই রচনা করা, তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া এবং যারা এটা রচনা করেছে তাদের ভাষায় একটি সূচনা হিসেবে আখ্যা দেয়া।
এখন যেভাবে লেবাননে গণহত্যা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তা ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা কৌশলের প্রতিচ্ছবিঃ মানুষ হত্যা, সাংবাদিকদের খুন, তাদেরকে জঙ্গি বলে অপবাদ, “টার্গেট” শব্দ ব্যাবহার করে অপকর্ম আড়াল করা। এই কারণেই বৈরুতের মত ঘন বসতিপূর্ণ শহরের বিভিন্ন এলাকায় বোমাবর্ষণকে এখনও হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে হামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়, কারণ এটি পশিমা বিশ্বকে দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দেয় যেন তারা একজন সার্জনকে টিউমার অপসারণ করতে দেখছে, অথচ বাস্তবে তারা একজন অগ্নিসংযোগকারীকে দেখছে যে সম্পূর্ণ বাড়িতে আগুন লাগানোর আগে সেটিকে রোগাক্রান্ত বলে আখ্যা দিচ্ছে। এবং যেই আরব বার্তা বিভাগগুলো গাজার সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ঝুঁকিতে ফেলেছিল তারাই এখন দৃশ্যত আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে কারণ বোমা হামলার শিকার মানুষগুলো শিয়া।
আনাস আল-শরিফ, উত্তর গাজায় আল-জাজিরার শেষ সংবাদ প্রতিনিধিদের একজন গত আগস্ট মাসে নিহত হন কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলের বানোয়াট অভিযোগের পর যে তিনি একজন হামাস কর্মী। কয়েক মাস পর, লেবাননে প্রেস চিহ্নিত একটি গাড়ি হামলার শিকার হয় এবং তিনজন সাংবাদিক এর ভিতরেই নিহত হনঃ ফাতিমা ফাতুনি, তার ভাই মোহাম্মাদ এবং আলী শুয়াইব।
দক্ষিণের জন্য এগুলোর একটাও নতুন নয়। ১৯৭৮ এবং আবার ১৯৮২ সালে এখনকার গ্রামগুলো বোমা হামলার শিকার হয়েছিল, যে আগ্রাসন হিজবুল্লাহর জন্ম দেয়, উভয় আক্রমণই এই দাবির উপর ভিত্তি করে যে ফিলিস্তিনিরা লেবাননের ভূখণ্ড থেকে যুদ্ধ করছে। প্রতি মহররম মাসে দক্ষিণে কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। কারবালা একটি সৈন্য বাহিনীর গল্প যারা একটি ছোট শিবিরকে ঘিরে ফেলেছিল যেখানে শিশুরাও ছিল, দিনের পর দিন তারা কিছুই করেনি শুধু পার্শ্ববর্তী নদী থেকে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, যতক্ষণ না ছোট শিশুটি পিপাসায় মারা যায়। অথচ যারা তাদের পাশে থেকে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা পুরোটা সময় ঘরেই রয়ে গেল। যারা এই হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তাদেরকে বন্দি করে দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই ব্যাক্তির দরবারে যে তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, সেখানে আপনজন হারানো একজন নারী তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং চুপ থাকতে অস্বীকার জানালেন। এই গল্প কারও বিজয় দিয়ে শেষ হয়নি। এটি শেষ হয়েছিল যাদের পাওয়ার কিছু নেই এবং হারানোর মত অনেক কিছু আছে সেই মানুষদের উচ্চারিত একটি মাত্র শব্দ দিয়ে, লাব্বাইকা, “আমি উপস্থিত” তাদের উদ্দেশ্য করে যারা আগেই সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে, এ এমন এক জবাব যা দ্বিতীয়বার প্রশ্ন তোলার অপেক্ষা রাখে না।
এইজন্যই দক্ষিণকে নির্মূল করা হচ্ছে। তাদেরকে দেয়ার মত এমন কোনও প্রস্তাব নেই যা তারা এর আগেই গাজার ক্ষেত্রে পরিমাপ করে প্রত্যাখ্যান করে দেয়নি, এমন কোনও চুক্তি নেই যেখানে সীমানার ওপারে কী ঘটছে সেটাতে নজর দেয়া বন্ধ করতে বলা হয়নি। দুই বছর ধরে দক্ষিণ ছিল এমন এক অঞ্চল যা বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান ক্ষতি মেনে নিয়ে একদিনের জন্যও গাজা থেকে মুখ ফেরাতে রাজি হয়নি। কেউ ভুলবশত এর ধ্বংস সাধন শুরু করেনি।
লেবাননের মানুষ একদম নিশ্চিত যে ন্যায়বিচারের স্বরূপ সম্পর্কে তাদেরকে গণহত্যাকারী ইসরায়েল এবং ওয়াশিংটনের কিছু বলার প্রয়োজন নেই। লেবাননের মানুষ যারা গাজার মৃত্যুকে অন্য কারও মৃত্যু হিসেবে দেখতে অস্বীকার জানিয়ে বছরের পর বছর পার করেছে, আর এখন যাদেরকে একই রকমের মৃত্যুর মুখোমুখি হতে বলা হচ্ছে, একই সময়সূচিতে, একই কারণে, তারা খুব ভালো করে টের পেয়েছে সত্যিকারের ন্যায়বিচার কী এবং কীভাবে এর চর্চা হয়। যদিও পুরো বিশ্ব উপেক্ষা করছে, গাজার ক্ষেত্রেও যেমন গড়িমসি করেছিল, তবুও দক্ষিণ লেবাননে যতই হত্যাকাণ্ড চলুক জনগণ ফিলিস্তিনিদের মতই তাদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিবে না—যদিও তাদের সরকার বহু আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছে।
আহমাদ ইবসাইস একজন প্রথম প্রজন্মের ফিলিস্তিনি আমেরিকান এবং একজন আইনের ছাত্র যিনি স্টেট অফ সিজ নিউজলেটারটি লিখেছেন।
