স্পেনের মাদ্রিদে ৮৭ বছর বয়সী মারি কারমেন আবাসকালকে দাঙ্গা পুলিশ সহিংসভাবে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার পর দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে তিনি একটি পুরোনো ভাড়াচুক্তির আওতায় ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছিলেন। মাদ্রিদ অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াস আয়ুসোর দাবির বিপরীতে, তিনি কখনোই বাড়িভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হননি। আবাসন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান উরবাগেস্তিওন (Urbagestión) তাঁর পক্ষে বহন করা অসম্ভব এমন হারে ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁকে উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। এই উচ্ছেদের ঘটনাই সামাজিক আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক ‘১৫এম’ (15M) আন্দোলনের ১৫ বছর পর মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোলসহ স্পেনের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
এই নির্মম উচ্ছেদ চলতি বছরে ইতোমধ্যে সংঘটিত চার হাজার উচ্ছেদের মাত্র একটি। কিন্তু ঘটনাটি সমাজের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে: লাখ লাখ তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, ডানপন্থীরা একটি সামাজিক বিপর্যয়কে উপহাস করছেন, আর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রগতিশীল বলে দাবি করা সরকার অবশেষে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে আবাসনসংকট সাধারণ মানুষের জীবনে কত বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাড়াটিয়া ইউনিয়নের (Tenants’ Union) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন আবাসন খাতে ফটকাবাজি বন্ধে জোট সরকারের কাছে পাঁচটি মৌলিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলো হলো: বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা না করে অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষদের উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করা; স্বল্পমেয়াদি ও কক্ষভিত্তিক ভাড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে নগর ভাড়াচুক্তি আইন (LAU) সংস্কার করা; চুক্তি নবায়নের সময় ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে বিদ্যমান ভাড়ার হার অপরিবর্তিত রাখা; চলতি বছর ও আগামী বছরের মধ্যে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া প্রায় দশ লাখ ভাড়াচুক্তির মেয়াদ বাড়ানো; এবং বাড়ির মালিকের নিজের বসবাসের প্রয়োজন না থাকলে ভাড়াচুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের ব্যবস্থা করা।
এসব দাবি যেমন ন্যায্য, তেমনি প্রয়োজনীয় ও জরুরি। স্প্যানিশ সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির (PSOE) নেতৃত্বাধীন সরকারের যথাযথ আবাসননীতির অভাব এমন এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যা সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে এবং কেবল সেই সব বড় সম্পত্তির মালিকের স্বার্থ রক্ষা করছে, যারা বাড়ির দাম ও ভাড়া নিয়ে ফটকাবাজি করেন এবং পাড়ামহল্লার সামাজিক চরিত্র বদলে দেন। অন্যদিকে, লাখ লাখ ভাড়াটিয়াকে তাঁদের আয়ের ক্রমবর্ধমান অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়ার পেছনে।
পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে স্পেনে মাথাপিছু গড় আয় বেড়েছে ৫০ শতাংশ এবং মজুরি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বাড়ি কেনার খরচ বেড়েছে ৮০ শতাংশ এবং বাড়িভাড়া বেড়েছে ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে, স্পেনের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের (INE) তথ্য অনুযায়ী, দশ বছরের ব্যবধানে দেশটির সবচেয়ে প্রচলিত বার্ষিক মজুরি ১৬ হাজার ৪৯৮ ইউরো থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে মাত্র ১৬ হাজার ৫২০ ইউরোতে পৌঁছেছে। বছরের পর বছর ধরে কার্যত বন্দুকের মুখে আমাদের সর্বস্ব লুট করা হচ্ছে, আর সরকারের সব স্তরই এই লুটপাটকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। স্পেনের আবাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, দেশটিতে সামাজিক আবাসনের সংখ্যা মাত্র ৩ লাখ ১৮ হাজার, যা মোট আবাসন মজুতের মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (OECD) তথ্য অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসে মোট আবাসনের ৩৪ শতাংশ সামাজিক আবাসন হিসেবে বরাদ্দ রয়েছে। এরপর রয়েছে অস্ট্রিয়া (২৪ শতাংশ), ডেনমার্ক (২১ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (১৬ শতাংশ) এবং ফ্রান্স (১৪ শতাংশ)।
এটাকেই বলে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা। এটি এক অনন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ সমাজের একটি বিশাল অংশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এভাবে আর চলতে পারে না। গুটিকয়েক মানুষকে আরও ধনী করে তোলার জন্য আমাদের মাথার ওপর একটি ছাদ থাকার বিনিময়ে আমাদের মজুরির অর্থ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
আবাসন খাত এখন ভাড়ার আয়নির্ভর পুঁজিপতি, শকুন তহবিল (vulture funds) এবং ব্যাংকগুলোর জন্য অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে ডানপন্থী ও উগ্র ডানপন্থীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু ও গণমাধ্যমের বয়ান নিয়ন্ত্রণে তারা অভ্যস্ত। এমনকি বিপদগ্রস্ত ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ করতে নব্য নাৎসি সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করতেও তারা পিছপা হয় না।
২৬ সেপ্টেম্বর কিছু একটা বদলে গেল।
প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ রাজধানী মাদ্রিদের রাজপথে সমবেত হলেন। কয়েক হাজার মানুষ মাদ্রিদের আঞ্চলিক সরকারের সদর দপ্তরের বাইরে অবস্থান নিলেন। এই আঞ্চলিক সরকার লাগামহীন ভাড়াভিত্তিক মুনাফা অর্জনের এক শক্ত ঘাঁটি। এর নেতৃত্বে রয়েছেন এমন এক প্রেসিডেন্ট, যাঁর বিলাসবহুল পেন্টহাউসের প্রতি বিশেষ অনুরাগ এবং অস্বচ্ছ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রতি পক্ষপাত রয়েছে।মানুষ অসীম মর্যাদাবোধ নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন এবং ঘোষণা করেছেন, ‘অনেক হয়েছে, আর নয়।’ এই প্রতিবাদ শুধু পিপলস পার্টি (PP) ও ভক্স (Vox) পরিচালিত আঞ্চলিক সরকারগুলোর বিরুদ্ধেই নয়।
বিক্ষোভকারীরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এই পরিস্থিতির জন্য পেদ্রো সানচেসের সরকারও দায়ী। গত আট বছরে পিএসওই এবং তার মিত্ররা ফটকাবাজি ও ভাড়ানির্ভর মুনাফা অর্জনের ব্যবস্থাকে বিনা বাধায় আরও শক্তিশালী হতে দিয়েছে। বামপন্থী বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য একটি পদক্ষেপও তারা গ্রহণ করেনি। বরং তারা এমন এক বাজারব্যবস্থার নিয়ম মেনে নিয়েছে, যার পুরো কাঠামোই প্রভাবশালীদের স্বার্থে সাজানো। আজকের এই বিপর্যয় তারই পরিণতি।
এবার সরকার তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে একটি নয়, দুটি ডিক্রি অনুমোদন করা হয়েছে। প্রথম ডিক্রিটি ক্ষমতাসীন জোটের শরিকদের সম্মতিতে গৃহীত হয়েছে। এতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে; স্বল্পমেয়াদি ও কক্ষভিত্তিক ভাড়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে; ২০২৮ সাল পর্যন্ত শকুন তহবিলগুলোর সম্পত্তি কেনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে; এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৮-এর আগে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া বিদ্যমান ভাড়াচুক্তিগুলোর মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া পিএসওই ও সুমার (Sumar) ভাড়াচুক্তির স্বয়ংক্রিয় নবায়নের বিষয়ে একমত হয়েছে। এই বিধান দ্বিতীয় রাজকীয় ডিক্রিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যা শুক্রবার, ২ অক্টোবর পার্লামেন্টের বিশেষ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে উত্থাপনের কথা রয়েছে।
সিটিএক্সটি (CTXT)-এর দৃষ্টিতে, গৃহীত পদক্ষেপগুলো অনেক দেরিতে এসেছে, কার্যকারিতার দিক থেকে দুর্বল এবং সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত।
সমাজ আবাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন দাবি করছে। তারা এমন কোনো সুবিধাবাদী কিংবা সাময়িক জোড়াতালির সমাধান চায় না, যা মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে অনিয়ন্ত্রিত বাজারের সৃষ্টি করা ভয়াবহ সামাজিক অবিচার দূর করতে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে না।এই লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোতে আমরা মনে করি, ভাড়াটিয়া ইউনিয়ন এবং শ্রেণিভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আবাসনের অধিকার আদায়ে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট সংগঠিত করা জরুরি। কারণ অধিকার কেবল রাজপথেই অর্জিত হয় কিংবা পুনরুদ্ধার করা যায়—শ্রমিক শ্রেণি ও শিক্ষার্থীদের সংগঠিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। আর কারণ এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত আমাদের সামনে এক অনিবার্য দাবি হাজির করেছে: গুটিকয়েক কোটিপতির মুনাফা অর্জনের জন্য আবাসনকে ফটকাবাজির ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করার ধারণার চিরতরে অবসান ঘটাতে হবে। বাসস্থানকে স্বীকৃতি দিতে হবে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে, এমন এক অপরিহার্য অধিকার হিসেবে, যা ছাড়া কারও পক্ষেই মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।
