চীনে সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র গড়ে তোলা

DocumentSocialism

ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য, তৎকালীন সমাজবাদী গঠনের উপর একটি গবেষণার সংকলন, পাভেল রন ও জাইসেন হিকেল চীনে "সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র"-এর ধারণা পরীক্ষা করছেন, এটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এবং স্থানীয় স্তরের প্রশাসনে অংশগ্রহণ করার একটি জটিল পদ্ধতি যা চীনা আধুনিকীকরণের এক মুখ্য স্তম্ভ।

ভূমিকা

চুংকিং এর উদীয়মান মেট্রোপলিসের জোলংপো জেলার একটি ছোট্ট কমিউনিটি মিনঝু গ্রামে এক তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তর ঘটেছে। একদা জরাজীর্ণ বাড়িঘর, সরু, কর্দমাক্ত রাস্তা থাকা মিনঝু এখন এক আধুনিক কমিউনিটি, যেখানে লাল ইট দিয়ে তৈরি বাড়ি, সাজানো-গোছানো রাস্তাঘাট ও সমৃদ্ধশালী গণ পরিষেবা রয়েছে। সেখানে কৃষকদের জন্য বিভিন্ন উপাদানের পুনঃব্যবহার করে তৈরি করা এক স্থায়ী বাজার রয়েছে, জনগণের জন্য একটি  ক্যান্টিন রয়েছে সেখানে বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়, ফিটনেস পার্ক আছে, জনগণের সামনে পারফরম্যান্স করার জন্য বিভিন্ন মঞ্চ রয়েছে, আধুনিক ও সাশ্রয়ী মূল্যের বিভিন্ন ক্যাফে রয়েছে এবং একটি হস্তনির্মিত বিয়ার বার আছে যেখানে একের পর এক শিপিং কন্টেনার সাজানো আছে। প্রধান চত্বরে, তিনতলা ক্যান্টিনের উল্টোদিকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (CPC)-এর একটি ঝাঁ চকচকে সরকারি অফিস রয়েছে, যেখানে গিয়ে এখানকার জনগণ পার্টির কর্মীদের কাছ থেকে প্রতিবেশীদের মধ্যে হওয়া ঝামেলা থেকে শুরু করে তাদের বাড়ি মেরামত করার মতো যে কোনো বিষয়ে সহায়তা পেয়ে থাকেন। এই কয়েক বছর আগেও, চলাচলের প্রধান রাস্তার দৈর্ঘ্য বরাবর থাকা একটি নালা দিয়ে নর্দমার ময়লা প্রবাহিত হতো। আর এখন সেটির জায়গায় যে খাল করা হয়েছে তাতে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা পা ডুবিয়ে বসে থাকতে পারে।

একসময় মিনঝু গ্রামে চীনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ অবস্থিত ছিল: রাষ্ট্রের মালিকানাধীন চুংকিং কনস্ট্রাকশন মেশিন টুল ফ্যাক্টরি (国营建设机床厂)। এই ফ্যাক্টরির উৎপত্তির সাথে সেই হানইয়াং আর্সোনাল (汉阳兵工厂)-এর সংযোগ রয়েছে, ছিং সাম্রাজ্যের সময়ের এক মুখ্য অস্ত্র প্রস্তুতকারক। দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের সময় হানইয়াং আর্সোনাল জোলংপো জেলায় চলে যায় এবং 1957 সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সেটির নাম পরিবর্তন করে দ্য মেশিন টুল ফ্যাক্টরি রাখা হয়েছিল। এই ফ্যাক্টরিটি চীনের সবথেকে বড় সামরিক এন্টারপ্রাইজ হয়ে উঠেছিল, যেখানে সেমি অটোমেটিক রাইফেল ও সাবমেশিন বন্দুক তৈরি করা হতো। এটির সফলতার চরম পর্যায়ে ফ্যাক্টরিতে ২০,০০০-এরও বেশি কর্মচারীরা কাজ করতো এবং তাদের বসবাস করার জন্যই মিনঝু গ্রামটি তৈরি করা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যাপার্টমেন্টের স্টাইলের অনুকরণে এটিকে ব্লকের মতো করে তৈরি করা হয়েছিল ও লাল- কমলা রঙের ইট ব্যবহার করা হয়েছিল, এই গ্রামটি দ্রুত শিল্পায়ন ও পরিবর্তন তুলে ধরেছিল যা পরে সমগ্র দেশের ছড়িয়ে পড়ে।

2009-এ এক নতুন নগর বিকাশ নীতির অংশ হিসেবে মেশিন টুল ফ্যাক্টরি বানান হোয়াসি জেলার ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ইতিমধ্যে আবহাওয়ার কারণে ও জীর্ণ হয়ে পড়া মিনঝু গ্রামের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। এটির পরিকাঠামো বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং এখানে বসবাসকারী জনগণের বয়স বেড়ে যায় ও ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমে যায়। কর্মকর্তারা এই গ্রামটিকে নষ্ট করে দেওয়ার ও সেখানে বসবাসকারী ব্যক্তিদের অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করেছিল। তবে সেখানে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের ওই জায়গাটার প্রতি বংশ-পরম্পরায় ধরে এক বন্ধন গড়ে ওঠে, দেশের কাছে এই বিষয়টির এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই নষ্ট করে দেওয়ার পরিবর্তে সেখানে এক সামগ্রিক পুনর্গঠন কর্মসূচি করা শুরু হয়েছিল। পরে তা সমগ্র দেশের জন্য এক আদর্শ মডেল হয়ে ওঠে - এবং চীনের বিকাশে সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে উঠে। ২০২১-এ শহর পুনঃনির্মাণ পাইলট প্রোগ্রাম চালু হওয়ার পরে, CPC মিনঝু নামে শতাধিক "বাগান বৈঠক" আয়োজন করেছিল — প্রধান চত্বরে সম্প্রদায়ের লোকজনরা জড়ো হয়েছিলেন যেখানে সেখানকার নিবাসীরা বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছিলেন, বিভিন্ন মতামত জানিয়েছিলেন এবং আশেপাশের এলাকার  পুনঃবিকাশ ঘটানোর বিষয় বিভিন্ন ধারণা ভাগ করে নিয়েছিলেন। মেলবক্স নং. ১, যা মূলত 1953-এ প্রতিষ্ঠিত একটি মেল বক্স, যেটি মেশিন টুল ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের কমিউনিকেশন চ্যানেল হিসেবে কাজ করতো, সেটিকে ডিজিটাল করে দেওয়া হয় এবং একটি আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রামের মাধ্যমে সেটিকে চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে নিবাসীদের থেকে সহস্র পরামর্শ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এবং একটি স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল যাতে ওই সম্প্রদায়ের বিভিন্ন স্তরের জনগণের ওপর সমীক্ষা করা যেতে পারে — এই কাজেও মেলবক্সটিকে কাজে লাগানো হয়েছিল।

 আজকের দিনে, মিনঝু গ্রামের বিভিন্ন অংশের সাথে লন্ডন বা বার্লিনের ফ্যাশনেবল, ঝাঁ-চকচকে স্থানগুলোর তুলনা করা হয়। তবে, এর প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর রূপান্তর করার ক্ষেত্রে এক ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল যা পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ মেট্রোপলিসে প্রায়শই করা হয়ে থাকে। বেশিরভাগ মুখ্য শহরকে উচ্চমানের করে তোলার জন্য যে সমস্ত গুণগত পরিবর্তন করা হয় সেগুলো এই পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হলেও, এর জন্য মিনঝু গ্রামে বসবাসরত স্থানীয় শ্রমিকদের বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়নি। বরং, এর ফলে তাদের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটেছে, যা অনেকটা শহরের মধ্যবিত্ত বাড়ির মতো হয়ে ওঠে — দারিদ্রতা ঘুচে যায় এবং CPC-এর মতামত অনুযায়ী "মধ্যম প্রকৃতির সমৃদ্ধি" ঘটে, এটি হলো বিকাশের একটি পর্যায় যেখানে সকলের কাছে বেঁচে থাকার জন্য সাধারণ প্রয়োজনীয়তাগুলো পূরণ হয়ে যায় এবং সকলে আরামপ্রদভাবে জীবনযাপন করতে থাকে। এই পুনঃবিকাশ প্রক্রিয়ার আগে, চলাকালীন ও পরবর্তীতে সম্প্রদায়ের সদস্যরা বারবার বলেছিলেন যে এটি করা প্রয়োজন ছিল। কৃষকদের বাজারটি আধুনিক করে দেওয়া হয়েছিল, খালটি পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল, ক্যান্টিনটি তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল এবং অবসর সময় কাটানোর জন্য, বিনোদনের জন্য বিভিন্ন নতুন প্রতিষ্ঠান ও জায়গা তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল এবং বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।১ 

এই প্রক্রিয়াটি বিস্তৃতভাবে জনগণের মতামত নিয়ে গঠিত যা কর্মরত ব্যক্তিদের জীবনে পরিবর্তন এনে দেয় — চীনের "সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র"-এর ধারণার মূল ভিত্তিপ্রস্তর। এর মাধ্যমে এক যুগান্তকারী পদ্ধতি উঠে এসেছে যার জন্য ক্রমাগত জনগণের ধারণা শুনে, বুঝে, পদ্ধতিগত পদ্ধতিতে রূপান্তর করে একটি "গণরেখা" তৈরি করা প্রয়োজন। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া হতে পারে। এরহাই হ্রদের পুনর্গঠন করার সময় এটি কীভাবে কাজ করেছিল তা বিশদে সিয়ং জিই ও টিংস চক বর্ণনা করেছেন, এটি নিয়ে বিভিন্ন দ্বন্দ্বের সমাধান করা, সমঝোতা করা এবং বাস্তবায়িত সমাধান অর্জনের জন্য বেশিরভাগ জনগণের সমর্থন অর্জন করার জন্য, পার্টির কর্মকর্তা ও স্থানীয় নিবাসীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মতবিনিময় চলেছিল।২

এই পদ্ধতিটি মূলত পাশ্চাত্যে চীনের সরকারে গণতন্ত্রের ও জনগণের সমর্থনের অভাব সম্পর্কিত বিদ্যমান মতামতগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল — এটি এই বিষয়টি তুলে ধরেছিল যে পাশ্চাত্যের উদার গণতন্ত্রের মডেলের তুলনায় চীনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনেক দিক দিয়ে আরও বেশি প্রতিক্রিয়াশীল এবং জনগণ এতে আরও বেশি পরিমাণে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। একথা সত্যি যে, এই প্রশ্নের ভিত্তিতে একাধিক অধ্যয়নে ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছিল —  এরমধ্যে এমন অনেক সংস্থা ছিল যেগুলো পাশ্চাত্যের উদার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল — যাতে দেখা গিয়েছে যে শুধুমাত্র চীনের সরকারই নয়, চীনে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা বিশ্বাস করেন যে এনাদের রাজনৈতিক পদ্ধতিটি গণতান্ত্রিক, যুক্তিসংগত এবং বিশ্বের অন্যান্য জায়গা তুলনায় এখানকার সরকার বেশি পরিমাণে জনহিতকর পরিষেবা দিয়ে থাকে।

এই পেপারটিতে চীনের গণতান্ত্রিক মডেলের একটি সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হয়েছে। সর্ব প্রথমে, উদার গণতন্ত্রের সাথে সামাজিক গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগত যে সমস্ত পার্থক্য রয়েছে তা উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, চীনের "সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র"-এর বৈশিষ্ট্যগুলো এবং পাশ্চাত্যে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক মডেলগুলোর সাথে এটির পার্থক্য নিরীক্ষণ করা হয়। তৃতীয়ত, এটি চীনের গণতন্ত্রে সিস্টেমের সমর্থনে উপলব্ধ ডেটা এবং এটি সম্পর্কে জনগণের মতামত নিরীক্ষণ করে।

সামাজিক গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়?

 পাশ্চাত্যের অনেকের কাছে, গণতন্ত্র বজায় রাখতে গেলে একাধিক পার্টির উপস্থিতি থাকা দরকার যাদের প্রত্যেকের কাছে ভবিষ্যতের সমাজ সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন মতামতের সাপেক্ষে তারা নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, রাষ্ট্র একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং গণতান্ত্রিক কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ "একজন ব্যক্তির একটি ভোট দেওয়ার অধিকার" নীতির ভিত্তিতে সুনিশ্চিত হয়ে থাকে।

এটি একটি ভালো পন্থা তবে বিভিন্ন শ্রেণীর লোকেদের ক্ষমতা এক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত থাকে না। এমন সিস্টেমে, সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর ব্যক্তিদের, যাদের কাছে বেশিরভাগ অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকে — তাদের পক্ষে এমন রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণ করা সহজ যা তাদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি করতে সহায়তা করবে, তারা রাষ্ট্রকে নির্দ্বিধায় কাজ করতে দেবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিকূলতা গড়ে  উঠতে দেবে না। অবশ্যই পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে এটি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে রাষ্ট্র পুঁজিবাদী শ্রেণীর শাসন করার একটি সরঞ্জাম হয়ে ওঠে। এটির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কার্যকলাপের ব্যবহার করে একশ্রেণীর জনগণ অন্যদের উপর আধিপত্য বাড়তে থাকে ও তা আরও অভেদ্য হয়ে ওঠে। ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘স্থিতিশীলতা’-র নামে সমাজে শ্রেণি-সংঘাতকে দমন করা হয়, যাতে পুঁজিপতিদের ক্ষমতা টিকে থাকে এবং শ্রমিকদের জন্য কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি না হয়। বস্তুত, উদার গণতন্ত্রে বুর্জোয়া শ্রেণীর কাছে স্বৈরতান্ত্রিক কার্যকলাপ করা ও একত্রীকরণ ঘটানো সহজহয়ে ওঠে

"সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রকে অবশ্যই... এক ঐতিহাসিক, বহু-প্রজন্মভিত্তিক ও দ্বন্দ্বমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত এর ফলে সমাজের বেশিরভাগ অংশের মানুষ প্রশাসনিক কাজকর্মে বেশি করে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করার সুযোগ পাবে, তাদের বক্তব্য শোনা হবে এবং তারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে।"

পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলিকে সাধারণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্রের প্রয়োগ খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুইটি প্রতিষ্ঠান পার্টির মধ্যে ক্ষমতার অদলবদল হতে থাকে, আর উভয় পার্টিই রূঢ়ভাবে খুবই পুঁজিবাদী এবং পুঁজিবাদী শ্রেণীর জনগণের স্বার্থ পূরণ করতে  অঙ্গীকারবদ্ধ। সমাজবাদী পার্টি সহ তৃতীয় পার্টিগুলোকে কার্যকরীভাবে জাতীয় রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে; ব্যালটে নাম নথিভুক্ত করার সময় এবং প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের সময় নিজেদের বক্তব্য পেশ করার জন্য তাদেরকে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। এর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এলিট সম্প্রদায় ও কর্পোরেশনগুলো প্রচারাভিযানের জন্য অগণিত অর্থ ব্যয় করে থাকে যাতে তাদের পছন্দসই রাজনীতিবিদের প্রচার ঘটানো যায় ও তাকে ক্ষমতায় আনা যায় যিনি এনাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করবেন, এটিকে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দুর্নীতির মাধ্যমেই ব্যক্ত করা সম্ভব। এই সমস্ত পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে।

২০১৪ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনার পক্ষ থেকে একটি অধ্যয়ন প্রকাশিত করা হয়েছিল, যেখানে উল্লেখিত ছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রয়োগ করার পদ্ধতি সাধারণত এলিট গোষ্ঠী ও সংগঠিত ব্যবসায়িক লবিগুলোর পছন্দ অনুসারে হয়ে থাকে, এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের বিরোধিতা থাকলেও এটি করা হয়।   অন্যভাবে বলতে গেলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বদলে অল্প কয়েকজন ব্যক্তিদের মধ্যেই ক্ষমতা সীমিত থাকে। মতামত জানানোর জন্য করা বিভিন্ন সমীক্ষায় এই বাস্তবতা উঠে এসেছে।  ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্সের ডেটা থেকে দেখা যাচ্ছে যে মাত্র 54% মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিবাসীরা মনে করেন যে তাদের দেশ সত্যিকারে এক গণতান্ত্রিক দেশ এবং শুধুমাত্র 42% জনগণ জানিয়েছেন যে সরকার বেশিভাগ জনগণের হিতে কাজ করে।  এই সমস্ত নজরকাড়া পরিসংখ্যান এমন এক দেশ থেকে পাওয়া গেছে যে নিজেকে “গণতন্ত্রের” আঁতুড় ঘর হিসেবে দেখিয়ে থাকে।

এমনকি যে সমস্ত দেশে একাধিক পার্টির বলিষ্ঠ সিস্টেম রয়েছে এবং প্রচারাভিযানে ব্যবহৃত অর্থের ওপর নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যেমন, এমন পরিস্থিতিতে যেখানে প্রভাবশালী গণমাধ্যম সংস্থাগুলো বিভিন্ন পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন অথবা কোটিপতি ও অল্প সংখ্যক ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মাধ্যমে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয়, সেক্ষেত্রে এটা কার্যত স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় যে সেখানে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলনের বক্তব্য কার্যত ন্যায্যভাবে শোনা হয়না। ব্রিটেনে ২০১৭ সালের নির্বাচনের সময় আমরা দেখেছিলাম যে বেশিরভাগ মিডিয়া কোম্পানিগুলো র‍্যাঙ্ক দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এবং সম্মিলিতভাবে একটি ভুল তথ্য যুক্ত প্রচারাভিযান চালিয়েছিল যেটিতে বামপন্থী সমাজবাদীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছিল এবং তারা সফলভাবে তাদেরকে ক্ষমতা অর্জন থেকে দূরে রেখেছিল।

এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, পুঁজিবাদের অধীনে গণতন্ত্রকে গুরুত্বহীন করে, তা রাজনৈতিকক্ষেত্রে এক পর্যায়ক্রমিক ও খুবই রীতিপূর্ণ অংশে পরিণত করা হয়েছে তবে অর্থনৈতিক পরিসরে এটিকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা হয়েছে, যদিও শেষের বিষয়টি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের উপর প্রভাব ফেলে এবং আমাদের সভ্যতার রূপ নির্ধারণ করে ও তাতে নির্দেশনা দিয়ে থাকে। যখন উৎপাদনের ওপর পুঁজির নিয়ন্ত্রণ থাকে, তখন উৎপাদন ও পুনর্নিবেশ উদ্দেশ্য আর মানুষের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা, সামাজিক অগ্রগতি ঘটানো বা জনগণের সমর্থিত বিষয়গুলো প্রকাশিত করা থাকে না; তখন তাদের উদ্দেশ্য হয় তাদের লাভের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলা ও অর্থ উপার্জন করতে থাকা। আমাদের শ্রম ও সৃজনশীল সক্ষমতার যেভাবে ব্যবহার করা হবে সেই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কিছু পুঁজিবাদী শ্রেণীর সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নেওয়া হয়ে থাকে। শ্রমিক শ্রেণী — যারা প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদন করে থাকেন, তাদের বক্তব্য শোনা হয়ই না। এই পদ্ধতি স্পষ্টভাবেই গণতান্ত্রিক নয়।  নির্দ্বিধায় এটা বলা যেতে পারে যে, সমাজে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেমনই থাকুক না কেন তা নির্বিশেষে যদি জনগণের হাতে তাদের উৎপাদন এবং  তাদের তৈরি উদ্বৃত্তের ওপর করা বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা না থাকে তাহলে সেটিকে গণতন্ত্র বলা যায় না । এই ব্যবস্থা বিরূপ ফলাফল এনে দিতে পারে যা আমরা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে দেখতে পাই , যেখানে উৎপাদন করার জন্য অনেক টাকা খরচ করা হলেও সাধারণ প্রয়োজনীয়তা যেমন সুলভ মূল্যে বাসস্থান, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার মতো বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবত ঘাটতি দেখা যায়।

পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র এক বিপজ্জনক বস্তু এবং যতটা সম্ভব এটিকে দমিয়ে রাখা হয়েই থাকে। বস্তুত, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে প্রতিবাদী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠলে ও বিশ্বজুড়ে আমূল পরিবর্তন দেখা দিলে তবেই পুঁজিবাদীরা শ্রমিক শ্রেণীর মানুষদের অব্যাহতি দিয়েছে। ২০ শতাব্দীর প্রথমের দিকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিস্তার ঘটার পরে ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক আন্দোলন দেখা দিয়েছিল যা সেই পুঁজিবাদী শ্রেণীর চিন্তাধারায় গড়ে উঠেছিল যাদের লক্ষ্য ছিল বিপ্লবী আন্দোলনকে স্থিতিশীল করা। পাশ্চাত্যের প্রথমের দিকে গৃহীত সামাজিক নীতিগুলোতেও অক্টোবর, ১৯১৭-এর আন্দোলনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হওয়ার এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালে ওয়েস্টার্ন ইউরোপিয়ান কমিউনিস্ট দলগুলোর অন্তর্ভুক্তির ফলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঝুঁকির অনুভব পাওয়া যাচ্ছিল।  

20 শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধাংশে, বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে এক দৃঢ় সামাজিক গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কার্যপ্রণালীগত দ্বন্দ্ব দেখা দিতে থাকে যা ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিপুল মর্যাদা অর্জন করেছিল এছাড়াও এর কারণে শিল্পায়ন ও সামাজিক বিকাশে নজিরসৃষ্টিকারী অগ্রগতি দেখা দিয়েছিল। পাশ্চাত্যের শ্রমিক শ্রেণীর কাছে এটি একটি প্রকৃত জয় ছিল , যদিও এটা মনে রাখা দরকার যে পুঁজিবাদীরা এগুলো করতে দিয়েছিল কারণ তারা জানতো যে গ্রাম্য অঞ্চলে উৎপাদিত থেকে নেওয়া অতিরিক্ত সামগ্রীর মাধ্যমে তারা নিজেদের অর্থ উপার্জনের রাস্তা বজায় রাখতে পারবে। সামাজিক গণতন্ত্র মূলত সর্বদা সাম্রাজ্যবাদী পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করে থাকে।

গত দশকগুলোতে অর্থনীতিতে যে হারে বিকাশ ও সঞ্চয়ের সুযোগ দেখা দিয়েছিল তা অর্জন করতে, বর্তমানের মূল অর্থনীতি প্রতিবন্ধকতা সম্মুখীন হচ্ছে এর মূল কারণ হলো গ্রাম্য অঞ্চলে অর্থনৈতিক স্বতন্ত্রতার জন্য আন্দোলন বৃদ্ধি পাওয়া। এর ফলস্বরূপ পাশ্চাত্যের সরকারগুলো দেশের ভেতরে সামাজিক গণতান্ত্রিক সমঝোতা ভেঙে দিচ্ছে এবং বহির্বিশ্বে সাম্রাজ্যিক সহিংসতার পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে, যার থেকে বোঝা যাচ্ছে যে শ্রমিক শ্রেণীর লোকেদের প্রতি পুঁজিবাদীদের প্রদত্ত স্বাচ্ছন্দ্য এতদিন অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছিল কারণ গঠনগতভাবে তারা ওনাদের আর্থিক লাভ এনে দিতে সক্ষম ছিল।

সমাজবাদীরা এই সমস্ত বিষয়গুলো অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। ওনারা বুঝতে পেরেছিলেন যে যেখানে মিডিয়ার মালিকানা কোনো বেসরকারির সংস্থার হাতে রয়েছে, বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের ক্ষমতার মধ্যে বিপুল তারতম্যের প্রেক্ষাপটে, সেখানে উন্মুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা দ্বারা প্রকৃত গণতন্ত্র গড়ে তোলা যাবে না। এটি বিশেষত গ্রাম্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে সত্য, যে ক্ষেত্রে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রয়োগ করা হয় এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিফল করে দেওয়া হয় এবং অভিজাত শ্রেণীকে বিভিন্ন ছলে বলে ক্ষমতায় রেখে দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক দলগুলো - যেমন রাষ্ট্র - তাদের শ্রেণীর বাইরে থাকা সমস্যাগুলো বুঝতে পারে না। দলগুলো বড় হতে থাকে জনগণের সমর্থন পেতে থাকে এবং কোন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের স্বার্থসিদ্ধির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে থাকে এবং এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ক্ষমতার বন্টনের ক্ষেত্রে বিপুল তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। শ্রমিক শ্রেণীর আদর্শ মেনে কোনো রাজনৈতিক দল তৈরি না হওয়ায় তাদেরকে ভিন্ন আদর্শের এক অন্য দলের সাথে রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত হতে হয়: এই আদর্শ প্রভুত্বশীল শ্রেণির আদর্শ। একাধিক, প্রতিযোগী পুঁজিবাদী দলগুলোর উপস্থিতি শ্রমিকদের বিভিন্ন গৌণ বিষয়ের ভিত্তিতে বিভাজন করে তাদের রাজনৈতিক সক্ষমতাকে সংকীর্ণ করে তোলে যা বুনিয়াদি শ্রেণীর শোষণমূলক কাজকর্মের উপর পর্দা ফেলে দেয়, এর উপর ভিত্তি করেই তাদের সমাজ ও তাদের জীবনযাত্রা সংঘটিত হয়ে থাকে। এর ফলে সংগঠিত, একত্রিত শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে মতভেদ, দ্বন্দ্ব দেখা দিতে থাকে, যেমন শ্রমিক শ্রেণীর মানুষদের স্বতন্ত্রতা অর্জনের জন্য একত্রিত করার বদলে তাদের অভিবাসনের ভিত্তিতে বিভক্ত করে দেওয়া। 

বিভিন্ন সম্ভাব্য সামাজিক বিকল্পের উন্নতি ঘটেছে। যেমন উৎপাদন ও রাষ্ট্রের উপর থেকে পুঁজিবাদী শ্রেণীর একচ্ছত্র ক্ষমতা সরে যাওয়ার পরে বহু দল সম্বলিত এক ব্যবস্থা আনা যেতে পারে যেখানে সমস্ত দলকেই সমাজবাদের সাধারণ নীতি মেনে চলতে হবে। এটি হলো বহু দল সম্বলিত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। তবে, এই পদ্ধতি সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের সামনে ভেঙে পড়তে পারে, যারা দলের মধ্যে থাকা দ্বন্দ্বের ব্যবহার করে কোনো দেশের মধ্যে অস্থিরতা এনে দিতে পারে অথবা কোনো সরকারের পতন ঘটাতে পারে।  চীন একটি বিকল্প উপায় অবলম্বন করেছে, যেখানে একটি মাত্র কমিউনিস্ট পার্টি রয়েছে যার অধীনে বহু সদস্য রয়েছেন যারা মূলত সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, যা সাংবিধানিকভাবে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থে বিভিন্ন কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ, যেটির মূল ভিত্তি বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে রয়েছে যেখানে জনগণের সাথে আলোচনা করার ও তাদের পরামর্শ  নেওয়ার সুবন্দোবস্ত রয়েছে  এবং এটি অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে সুসংগঠিত করা হয়েছে (গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীভূতকরণ)। 

রাজনৈতিক পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনা ছাড়াও, সামাজিক গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য হলো উৎপাদন ক্ষেত্রেও গণতন্ত্রের নীতি প্রয়োগ করা। যার উপর অর্থ নিবেশ করা হবে, কী উৎপাদন করা হবে এবং উৎপাদিত পদার্থের মাধ্যমে কারা উপকৃত হবে সেই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত - এই সমস্ত বিষয় জনগণের মতামত অনুযায়ী নেওয়া উচিত এবং সেগুলো শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে সমস্ত দাবি আনা হয় তার পরিসর অনেক বেশি বিস্তৃত হয়ে যায়। যদি পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র নিজেকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতার মধ্যে সীমিত রাখে — যে বিষয়গুলো নিজেরাই খুবই সীমিত, তাহলে রাষ্ট্রের মধ্যে পুঁজিবাদী শ্রেণীর আধিপত্য দেখা দিতে পারে — সামাজিক গণতন্ত্র তাদের পাশাপাশি জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর কারণ হলো অর্থনৈতিক বঞ্চনা থাকলে স্বতন্ত্র স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। কেউ ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত বা গৃহহীন থাকলে তাকে কি স্বাধীন বলা যেতে পারে? স্বাধীনতা শুধুমাত্র এক আলঙ্কারিক অঙ্গীকার নয়। নির্দিষ্ট কয়েকটি বস্তুগত ও ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা বাস্তবায়িত হওয়ার সাথে সাথেই অর্জন করা যেতে পারে। এতে স্থিতিশীল বিকাশসাধন প্রয়োজন এবং এমন এক রাষ্ট্রের প্রয়োজন যা সামাজিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে এই বিকাশ ঘটাতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে। দ্যজার্মানআইডিওলজি-তে যেমনটি কাল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস লিখে গেছেন:

সাধারণত, যতদিনজনগণপর্যাপ্তপরিমাণওগুণমানেরখাবারওপানীয়*,* বাসস্থানওপোশাকেরব্যবস্থাকরতেপারছেততদিনতাদেরকেস্বতন্ত্রকরেতোলাযাবেনা। 'স্বতন্ত্রতা' হলোএকটিঐতিহাসিকবিষয়*,* কোনোমানসিকবিষয়নয়এবংঐতিহাসিকপরিস্থিতিরভিত্তিতেইএটিঅর্জনকরাযেতেপারে। 

জনগণ ভিন্নভাবে নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে যা তাদের স্থানীয় ভৌগোলিক অর্থনৈতিক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে। এমন কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই যা সকলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার বাড়িয়ে তুলতে ব্যবহার করা যেতে পারে। ঠিক এই কারণেই সমাজতন্ত্রে বিকাশ সাধনের ক্ষেত্রে জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয়ে থাকে। সক্রিয়ভাবে আলোচনা না করলে, গণতন্ত্র অনেক ক্ষেত্রে এমন এক ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে জনগণ নীতিনির্ধারণে সক্রিয়ভাবে অংশ না নিয়ে কেবল নীরবে তা মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং সেই সমস্ত নীতির প্রকৃতি খুবই সাধারণ হয়ে থাকে। এটি সমাজতন্ত্রের একটি আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য যদিও  বর্তমানে বিদ্যমান সমস্ত সমাজতন্ত্রে এটি সমানভাবে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। 

দলের ক্যাডারদের সংগঠনের বিষয়ে, মাও সে-তুং এই বিষয়ের উপর জোর দিয়েছিলেন যে, "নেতৃত্ব স্থানীয় কোনো সদস্যই সমস্ত ইউনিটগুলোকে সাধারণ পথনির্দেশ দিতে পারবে না যদি না কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনা থেকে সে হাতেনাতে অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকে...” অন্যভাবে বলতে গেলে, দলের কর্মপদ্ধতির এবং সদস্যদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে এক স্বাভাবিক বন্ধন থাকা খুবই জরুরী। সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তিদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে কমিউনিস্ট পার্টিকে এমন এক শর্ত তৈরি করতে হবে যাতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজকর্মে বেশিরভাগ জনগণ অংশ নিতে পারে। এটি না করলে,  সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজে জনগণকে একই সূত্রের বেঁধে রাখা যাবে না এবং রাষ্ট্রের কর্মপদ্ধতি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা অন্যান্য সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য বিকৃত হয়ে যাবে।

তবে, যেমনটি বেশিরভাগ পাশ্চাত্যের মার্কসবাদীরা দাবি করে থাকেন বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে এমন এক অবস্থা তৈরি করা যাবে যেখানে সকলে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে, এমন দাবি করা আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া আর কিছু নয়। সামাজিক পরিবর্তন আনতে দীর্ঘ ও কঠিন পথ অবলম্বন করতে হতে পারে এবং শিক্ষা সংস্থান উৎপাদন ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠান গত স্থিতিশীলতার বৈষম্যের মাধ্যমে ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ভার বহন করার জন্য এক সুসংগঠিত কৌশল অবলম্বন করতে হবে। অতীতের দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক আচরণ গ্রহণ করে — শোষণ ও আনুগত্যের পরিকাঠামো — সহজে দূর করা যাবে না। চীনে প্রথমের দিকে হওয়া নির্বাচনে দেখা গেছে যে কৃষকরা একটি পাত্রের মধ্যে পাথর রেখে তাদের পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিতেন, কৃষকরা নিরক্ষর ছিলেন।

প্রত্যেক সমাজতান্ত্রিক দেশে বিরামহীন সামরিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রকোপে সাংস্কৃতিক ও তথ্যের উপর শোষণের কারণে এক ধরনের চরম অস্থিরতার পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, সাম্রাজ্যবাদের নৈরাজ্যিক ও ধ্বংসাত্মক পদ্ধতির সামনে সামাজিক পুনরুৎপাদনমূলক কাঠামোগুলো যাতে দুর্বল না হয়ে পড়ে সেই জন্য বিপ্লবী রাষ্ট্রগুলো জাতীয় সুরক্ষা ও শিল্পগত বিকাশের উপর বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। রাষ্ট্রের ভেতরে জনসার্বভৌমত্বের প্রকাশ হিসেবে গণতন্ত্রকে তার বস্তুগত সুরক্ষার বিবেচনা ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না, কিংবা সাম্রাজ্যবাদ যেসব কৌশলের মাধ্যমে এটিকে ব্যাহত করতে চায়, সেগুলো থেকে বিমূর্তভাবে আলাদা করে দেখা যায় না।

তাই, সামাজিক গণতন্ত্রকে অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক, বহু প্রজন্ম ধরে চলা ও ন্যায়সম্মত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে, যার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি, লালন ও রক্ষা করা সম্ভব হয়, যা সমাজের বেশিরভাগ অংশের মানুষদের প্রশাসনিক কাজকর্মে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়, তাদের বক্তব্য শোনা হয় ও তাদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়। আধুনিক ইতিহাসের বেশিরভাগ সমাজের তুলনায় চীনে এই পদ্ধতির অনেকটা বিকাশ ঘটেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাম্যস্তরের প্রতিষ্ঠানে করা পরীক্ষা থেকে শুরু করে নয় মিলিয়ন স্কোয়ার কিলোমিটার জায়গার মধ্যে থাকা ৫৬ টি ধর্মের ১.৪ বিলিয়ন জনগণের জন্য দেশব্যাপী এটি তৈরি করা হয়েছে,  এই প্রক্রিয়াটিকে "সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র" নামক মাধ্যমে বোঝানো হয়ে থাকে - এক শতকেরও বেশি সময় ধরে অর্জিত সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা।

সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র (Whole-Process People’s Democracy)

2014 সালের সেপ্টেম্বর মাসে চাইনিজ পিপল'স পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স (CPPCC)-এর প্রতিষ্ঠার 65 তম বার্ষিকীতে একটি সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি শি চিনফিং "সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র"-এর ধারণা সর্বপ্রথমবার উত্থাপিত করেছিলেন।.১০ শি "পরামর্শ" দেওয়ার ব্যবস্থার উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন যা চীনে সামাজিক গণতন্ত্রের সাথে দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্নিহিত ছিল। "জনগণের গণতন্ত্রকে কার্যকরী করা এবং দেশের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় জনগণকে প্রাধান্য দেওয়া সুনিশ্চিত করা"-র বিষয়ে উনি বলেছিলেন "এর জন্য, দেশের শাসন করার সময় আমাদের সমাজের প্রত্যেক স্তরে বিশেষ আলোচনা সভার ব্যবস্থা করতে হবে।"১১ 

চীনের বিপ্লবী প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা বুঝতে, CPC গড়ে ওঠার ইতিহাস ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। 1930 দশকের প্রথম দিক থেকেই, জিয়াংসি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের সময়ে, এই দল সক্রিয় রাজনৈতিক কার্যকলাপে জনসাধারণকে সংযুক্ত করার জন্য বিভিন্ন কৌশল নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করে দিয়েছিল — যাদের বহু শতক ধরে নিপীড়িত করা হয়েছিল এবং যে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা তাদের দমিয়ে রাখত, সেগুলোকে উৎখাত করার জন্য তারা কখনোই সঠিকভাবে সংগঠিত হয়ে উঠতে পারেনি — তাদেরকেই সক্রিয় রাজনীতির আঙিনায় হাজির করেছিল। ভালোভাবে বোঝা গিয়েছিল যে, বিপ্লব গড়ে তোলার জন্য এটিই একমাত্র উপায়।   সমাজের বেশিরভাগ জনগণকে তাদের নিপীড়কের বিরুদ্ধে না পারলে সাম্রাজ্যবাদের তিনটি স্তম্ভ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের পতন ঘটানো অসম্ভব ছিল। এই অঙ্গীকার থেকে "মাস লাইন" ধারণার এবং জনগণের মতামত পর্যালোচনা করার প্রক্রিয়ার উৎপত্তি ঘটে, যেখানে জনগণের মতামত অধ্যয়ন করা, সেগুলোকে সমন্বয় ও পদ্ধতিগতভাবে সাজানো এবং পরে আবার জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হতো—যাতে তা জনপ্রিয় বিশ্লেষণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয় এবং তাদের সঠিকতা সম্মিলিত কর্মের মাধ্যমে পরীক্ষিত হতে পারে। সমাজে দেখতে পাওয়া দ্বন্দ্বের সমাধান চিহ্নিত করতে ও তার সমাধান কার্যকরী করতে এই কাজ বারংবার অবিরতভাবে করা হয়। মাও সে-তুং "আমাদের দলের সমস্ত রাজনৈতিক কাজে" বলেছিলেন যে "সমস্ত  সঠিক নেতৃত্বই অবশ্যম্ভাবীভাবে ‘জনসাধারণের মধ্য থেকে আসে এবং আবার জনসাধারণের কাছেই ফিরে যায়’।" ১২

চীনের লং বো গ্রামে ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ এর মধ্যে ঘটে যাওয়া বৈপ্লবিক রূপান্তরের জাতিতাত্ত্বিক অধ্যয়নে উইলিয়াম হিনটন লক্ষ্য করেছিলেন যে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কীভাবে শতাব্দী প্রাচীন বিভিন্ন ব্যবস্থা ও সামন্তবাদ প্রথার মূল কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ভূমি পুনর্বণ্টন করা এবং মহিলাদের তাদের অধিকার অর্জন করার পরামর্শের ভিত্তিতে এটি করা সম্ভব হয়েছিল। এটা পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে সামন্ত প্রভুদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি সেই সমস্ত পরিবারের মধ্যে পুনর্বণ্টন করে দেওয়া হোক যাদের বেশিরভাগ জনের কাছে শুধুমাত্র একটি হাঁড়ি ও এক জোড়া পোষাক ছিল। পরামর্শ গ্রহণ করেই নতুনভাবে সংযুক্ত করা জমির প্লটগুলো ম্যানেজমেন্ট করার পদ্ধতি গঠিত করা হয়েছিল। প্রতিটি পর্যায়ে যে সমস্ত সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং সেগুলোর বিজ্ঞানসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া এবং সেই সমস্ত সমাধানের বস্তুগত বাস্তবতার সাপেক্ষে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণ, জনগণের জন্য প্রশাসন পদ্ধতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। হিনটন লিখেছেন যে "এর ফলে কৃষকরা, কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশনা অধীনে থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করা নির্দেশনা দিয়ে, রাজনৈতিক জ্ঞান থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষা অর্জন করেছিল যা সীমিত সফলতা অর্জন থেকে শুরু করে সামগ্রিক সফলতা এনে দিয়েছিল।" "এবং এই পদ্ধতির মাধ্যমে তারা প্রাকৃতিক ও সামাজিক শক্তির পরোক্ষ ভুক্তভোগী থেকে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে, তাদের নতুন বিশ্বের সক্রিয় নির্মাণকর্তা হয়ে উঠেছিল।" ১৩

CPC-এর বিস্তর জনসমাবেশের মাধ্যমে বিপ্লব ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে কৃষক ও শ্রমিকদের অবস্থা উন্নত করার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল যা জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে মৌলিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল যা আজও চীনের সামাজিক ব্যবস্থার এক ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে। এই পদ্ধতি এক দশক ধরে গড়ে তোলা হয়েছিল — যেখানে উত্থান, পতন, সফলতা, বিফলতা সবই ছিল — তারপরে বিপ্লব ঘটেছিল। বর্তমানে, CPC বড় হয়ে উঠেছে যার মধ্যে ১০০ মিলিয়নেরও বেশি সদস্য রয়েছে এবং ৭৫ মিলিয়নের বেশি যুবক লীগ সদস্য রয়েছে। এর ফলে, প্রত্যেক পরিবার থেকে অন্তত একজন পার্টির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, এর মাধ্যমে যেমন এটা সুনিশ্চিত করা হয়েছে যে দলের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন বৈচিত্র্যের ও রাজনৈতিক ভাবাদর্শের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তেমনই নিশ্চিত করা হয়েছে যে চীনা সমাজের প্রতিটি কোণে থাকা ব্যক্তিদের চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য CPC-এর কাছে সরাসরি চ্যানেল গড়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণভাবে CPC গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীভূতকরণ মডেলের উপর কাজ করে যা দলের মৌলিক সাংগঠনিক নীতি ও নেতৃত্ব প্রদানের পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। এই মডেলের অধীনে দলের সদস্যদের সম্মিলিত জ্ঞান জানার জন্য দলের মধ্যে উদ্দীপনাময় তর্ক-বিতর্ক করতে উৎসাহিত করা হয়। তারপরে CPC-এর সদস্যরা সকলের সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করে থাকে, নিশ্চিত করে যে দলের কাজগুলো অভিন্ন লক্ষ্য অর্জন করার জন্য করা হচ্ছে।

এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি যে উদার গণতন্ত্রের আলোকে CPC-কে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সরঞ্জাম নয়। পরিবর্তে, এটি প্রশাসনিক কাজকর্মে জনগণের অংশগ্রহণ করার একটি মাধ্যম এবং এর পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক রক্ষাকবচও। বস্তুত, চীন কোনো একদলীয় রাষ্ট্র নয়। সেখানে নয়টি অফিসিয়াল দল রয়েছে: CPC ও আটটি গণতান্ত্রিক দল। এই ব্যবস্থা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, চীনে বহুদলীয় উদার গণতন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল। এর ফলে এটি সম্পূর্ণভাবে অ-গণতান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিল, ১৯১২ থেকে ১৯২৮-এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৩০০-টিরও বেশি দল গঠিত হয়েছিল, এই পদ্ধতির ফলে রাষ্ট্রে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন নেতার উদ্ভব ঘটেছিল, ৪৫টি ক্যাবিনেট তৈরি করা হয়েছিল ও ৫৯ জন প্রধানমন্ত্রী উঠে এসেছিলেন — ১৬ বছর ধরে রাজনৈতিক অরাজকতা চলেছিল। এই সময়ে, চিয়াং কাই-শেক-এর কুওমিনতাং-এর অধীনে একদলীয় স্বৈরতন্ত্রও ব্যর্থ হয়েছিল, যার ফলে অর্থনৈতিক অরাজকতা এবং সামরিক পরাজয় ঘটেছিল। এই সময় বিভিন্ন নতুন দল ক্ষমতা অর্জনের বাসনায় গড়ে উঠেছিল। একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল এবং এটি তৈরি করার দায়িত্ব CPC-এর কাঁধে এসে পড়ে। এর ফলে যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে সেখানে সমস্ত বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা মূলক সম্পর্ক ছেড়ে সহযোগিতা করার জন্য সকলকে বাধ্য করা হয়েছিল, যার ফলে প্রশাসনিক কাজকর্মে সমাজের বিভিন্ন প্রান্তের অংশগ্রহণকারীরা অংশগ্রহণ করতে সুযোগ পেয়েছিল — যেমন আইন সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা করা বা পরামর্শ দেওয়া। ১৪  

এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার এক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে যা কোন কাল্পনিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থেকে গড়ে ওঠেনি বরং চীনের বেশিরভাগ জনগণের জীবন যাত্রার বাস্তবিক অবস্থার উন্নতির মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। লিন সাংলি নীতি উন্নত করার দাবি রাখেন যাতে "জনগণের সর্বাত্মক সমর্থন" পাওয়া গিয়েছিল এবং তা থেকে "দীর্ঘস্থায়ী, স্থিতিশীল ও সুসংহত জাতীয় উন্নয়ন" ঘটেছিল — জনগণ যে সমস্ত প্রকৃত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো চেনার করা ও সমাধান করার জন্য কার্যকরী সুসংগঠিত প্রক্রিয়া তৈরি না করলে এই কৃতিত্ব অর্জন করা কার্যত অসম্ভব ছিল। ১৫ শি চিনফিং — যিনি তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো বাড়িয়ে তোলার কথা বলেছেন - তার বক্তৃতা ও লেখনীতে বারবার উল্লেখ করেছেন: 

জনগণেরমধ্যেবিস্তরআলোচনাকরানোরপ্রক্রিয়াটিহলোআসলেগণতন্ত্রকেএগিয়েনেওয়াওসমষ্টিগতজ্ঞানঅর্জনকরারপ্রক্রিয়া; জনগণেরচিন্তাকেএকত্রিতকরাওঐকমত্যগড়েতোলারপদ্ধতি*;* বৈজ্ঞানিকওগণতান্ত্রিকসিদ্ধান্তগ্রহণেরপদ্ধতি*;* এবংরাষ্ট্রেরপ্রকৃতমালিকহিসেবেজনগণেরভূমিকানিশ্চিতকরারপ্রক্রিয়া।শুধুমাত্রএইপদ্ধতিঅবলম্বনকরেইআমরানিজেদেরদেশেরপ্রশাসনওসামাজিকপ্রশাসনিককাজকর্মেরজন্যদৃঢ়ভিত্তিগড়েতুলতেপারি*;* একমাত্রএইউপায়েইআমরাএকত্রিতভাবেশক্তিশালীহয়েউঠতেসক্ষম।১৬

পাশ্চাত্যের উদার গণতান্ত্রিক মডেলগুলোতে তিনটি মুখ্য বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের ধারণা আদর্শবাদের আঁটসাঁট বেড়াজালের মধ্যে আঁটকে রয়েছে। এটিকে একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলা হয়ে থাকে যা  তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, এটি হলো এমন একটি দাবি যা নিজেদের অধিকার বাড়াতে চায় এমন সমস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উদার গণতন্ত্রকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়, যা করার সুযোগ এর মধ্যে নেই। পাশ্চাত্যে পুরা গণতন্ত্রকে গভীর করে তোলা, তার বিস্তার ঘটানো বা উন্নত করার বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয় না। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট অনুপস্থিতি থাকায়, চীনের বিশেষজ্ঞরা পাশ্চাত্যের ব্যবস্থাকে "কুসংস্কারাচ্ছন্ন" বা "অন্ধ আনুগত্যপ্রবণ" বলে উল্লেখ করেন।১৭ এর বিপরীতে "সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র"-কে ঐতিহাসিক ও দ্বন্দ্বপূর্ণ বস্তুবাদের পরিকাঠামোর মধ্যে বোঝা সম্ভব। এটি সদা প্রগতিশীল এক পদ্ধতি যেটির গভীরতা, বিস্তার প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়তে থাকে ও প্রশাসনিক কাজকর্মের সাথে বিপুল সংখ্যক জনগণকে সংযুক্ত করে এবং এর প্রভাব, এটি জনগণের জীবনযাত্রার উপর যে বস্তুগত ও সামাজিক উন্নতি এনে দিয়েছে তার মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়ে থাকে। চ্যাঙ এনফু ও চেন জিয়ান লিখেছেন যে, "গণতন্ত্রের মানব অনুসন্ধান ও চর্চার কোনো সীমা নেই"।১৮  

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, চীন তার নিজের ভুল ও ত্রুটি থেকে শিক্ষা অর্জন করে। অন্য সমস্ত দেশের মতোই এই দেশেতেও মতামত প্রদান ও দায়িত্ববোধের সঠিক ব্যবস্থা না থাকার কারণে নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়া দেশ ও এখানকার জনগণের উপর নেতিবাচক প্রভাব, কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল।. কিন্তু চীনের বর্তমান ব্যবস্থায় অতীত থেকে পাওয়া শিক্ষার প্রয়োগ করতে দেখা যায় এবং — প্রতিনিয়ত আত্মসমালোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে — অতীতের সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠতে নীতি পুনঃনির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্যের উদার গণতন্ত্র ব্যবস্থায় দেখা যায় যে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া ছাড়া অল্প কয়েকজন ব্যক্তিই এই সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেয় — আর এই ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময় অন্তর ঘটে এবং এটির কার্যকলাপ সীমিত, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা এই ভোটের ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলতে পারে ও বিকৃত ফলাফল আনতে পারে।  অন্যদিকে, চীনের গণতান্ত্রিক মডেলের উদ্দেশ্য হলো সবসময় সর্বস্তরের রাজনৈতিক কার্যকলাপে জনগণের বিপুলভাবে অংশগ্রহণ – "সর্বাঙ্গীণ" কথাটার মাধ্যমে এটিই বোঝানো হয়ে থাকে। এ কথা সত্যি যে ২০১৬ ও ২০১৭-এর নির্বাচনের সময় শহর ও কাউন্টি স্তরে জনগণের কংগ্রেসের মাধ্যমে নির্বাচন বুথে 900 মিলিয়নেরও বেশি ভোটদাতা অংশ নিয়েছিলেন — এই দুটি স্তর চীনের পাঁচটি স্তরের ভোট প্রক্রিয়ার বিশেষ অংশ যেখানে ৯০% কমিউনিটির লোকেরা অংশগ্রহণ করে থাকে।  অতীব সম্প্রতি কালে, ভোট দাতাদের মোট সংখ্যা এক বিলিয়নেরও বেশি হয়ে গেছে যা ভারতের মোট ভোট দাতার সংখ্যা থেকে বেশি এবং এর ফলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পাওয়া সমস্ত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্যে চীনের নির্বাচন সর্ববৃহৎ-এ পরিণত হয়েছে। তবে জনগণের অংশগ্রহণ শুধুমাত্র ভোট দেওয়ার বুথের মধ্যে সীমিত থাকলেই হবে না, ২০২১ সালের অক্টোবর মাসের এক বক্তৃতায়  শি চিনফিং এই বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন:

যদিজনগণশুধুভোটদেওয়ারসময়সক্রিয়থাকেএবংতারপরেনিষ্ক্রিয়হয়েযায়; যদিজনগণনির্বাচনেরসময়বড়বড়শ্লোগানশোনেনকিন্তুপরবর্তীতেতারমতামতেরকোনোউল্লেখথাকেনা*;* যদিশুধুমাত্রভোটচাওয়ারসময়জনগণকেপ্রাধান্যদেওয়াহয়আরভোটমিটেগেলেতাদেরগুরুত্বইদেওয়াহয়না*,* তাহলেসেটিপ্রকৃতগণতন্ত্রনয়। 

"এক ব্যক্তি এক ভোট"-এর ধারণার মধ্যে যে রাজনৈতিক সমতার অঙ্গীকার আছে তা নিজেই সমাজতন্ত্রে বিকাশ ও গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যে থাকা বিস্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। "সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র"-এ জনগণ নির্বাচন ছাড়াও বিভিন্ন রকমের পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা, সেমিনার, সম্মেলন, বিতর্ক সভা,  বৈজ্ঞানিক সম্মেলন বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, আলোচনা সভা, কাউন্সিল, সমালোচনা এবং অন্য বিভিন্ন মাধ্যমে জনপ্রিয় মতামতগুলো দিতে সুনিশ্চিতভাবে অংশগ্রহণ করেন যা আইন প্রণয়ন ও নীতির সুনির্দিষ্ট ফলাফল আনতে সহায়তা করে। এইভাবে চীন যখন তার নাগরিকদের জন্য আইন তৈরি করছিল, তখন জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য 10 বার আলোচনা সভার ব্যবস্থা করা হয়েছিল যেখানে 425,000 জনগণের কাছ থেকে এক মিলিয়নেরও বেশি মন্তব্য পাওয়া গিয়েছিল। ১৯ চীনে বর্তমানে প্রযোজ্য সংবিধানে 15তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ২০২৬ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত কার্যকরী হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে, চীনের সরকার জনগণের থেকে তিন মিলিয়নেরও বেশি পরামর্শ পেয়েছিল — এই সংখ্যা, ২০২০ সালে ১৪তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য গঠিত অনুরূপ ব্যবস্থায় প্রায় একই সময়সীমার মধ্যে যে সংখ্যক পরামর্শ জমা পড়েছিল,তার তিন গুণেরও বেশি।২০

শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে পুরো প্রক্রিয়ার গভীরতা বা ব্যাপকতা বোঝা সম্ভব নয় কারণ এর পেছনে রয়েছে জনমতামত আর ফিডব্যাকের এক বিশাল ও জটিল কর্মযজ্ঞ। যেমনটা আমরা মিনঝু গ্রামের সেই ডাকবাক্সের ক্ষেত্রে দেখি, ঠিক তেমনি সারা দেশজুড়েই সরকার ‘১২৩৪৫ সার্ভিস হটলাইন’ চালু রেখেছে। এই হটলাইনগুলো অভিযোগ পাওয়ামাত্রই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য তৈরি এবং তা কল সেন্টার, মেয়রের ডাকবাক্স, মোবাইল অ্যাপ কিংবা চীনের জনপ্রিয় সর্বেসর্বা অ্যাপ ‘উইচ্যাট’-এর বিভিন্ন গ্রুপ, সব মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে জনগণের সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়ার বিস্তৃত ব্যবস্থার একটি অংশ। এভাবে, দেশের প্রতিটি স্তরের সরকার জনগণের দাবির প্রতি সাড়া দেয় এবং তাদের প্রত্যক্ষ সমস্যাগুলো সমাধান করার চেষ্টা করে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নীতি তৈরির প্রক্রিয়াটি সাধারণত দীর্ঘ এবং বহু বছর ধরে হয়ে থাকে সেই সময়ে দেশের রাজনৈতিক দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণ আন্দোলন এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন নীতি সংক্রান্ত গবেষণা করা হয়, বিতর্ক এবং সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, এবং সেই সমস্ত মতামত পরে নীতি তৈরির প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, চায়না কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) ২০তম জাতীয় কংগ্রেসের আগে ৫৪টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্টাডিতে অংশ নিয়েছিল, যা অফিসিয়াল রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং মোট ৮০টি পেপার তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায়, ৬৪টি গবেষণা দল প্রদেশ, স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং পুরসভাতে মোট ১৭৯টি ফিল্ড সফর করেছিল; ২৫টি গবেষণা দল ৪৬৫টি সংস্থার লিখিত সমীক্ষা করেছিল; আর ১০টি গবেষণা দল ২৫২টি সংস্থাকে বিশেষভাবে গবেষণা করার দায়িত্ব দিয়েছিল। গবেষণা দলগুলো মোট ১৯,০২২ জন অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে কাজ করে এবং ১,৮৪৭ জনের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ ও সাক্ষাৎকার নেয়। ২০তম কংগ্রেসের রিপোর্ট নিয়ে অনলাইনে নেওয়া জনমত পরামর্শে আট মিলিয়নের বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।২১ 

তৃতীয়ত, উদারপন্থী গণতন্ত্র আসলে মূলত পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা এবং তাদেরই স্বার্থ রক্ষার জন্য পরিচালিত হয়। ফলস্বরূপ, সমাজের রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে খুব সচেতনভাবে এমন এক সংকীর্ণ সীমার মধ্যে আটকে রাখা হয়, যাতে শ্রমের ওপর পুঁজির আধিপত্য অক্ষুণ্ন থাকে আর নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থাও সেখানে খুবই সীমিত। নির্বাচনের সময় ছাড়া যখনই মানুষ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়, তখন তা প্রায়শই সরকার ও রাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে এই সক্রিয়তা আসে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এর কারণ হলো, রাষ্ট্র যখন পুঁজিবাদী শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পুঁজিবাদী শ্রেণি শোষণের মাধ্যমে নিজেদের লাভ সর্বোচ্চ করতে চায়, আর শ্রমজীবী শ্রেণি সেই শোষণ থেকে মুক্তি পেতে চায়। বিপরীতে, একটি বিপ্লবী সমাজে সাধারণ মানুষই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয়। তাই তারাই রাষ্ট্র গঠন করে এবং তারাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও বৈধতার প্রধান উৎস। মাও সেতুং যেমনটা লক্ষ্য করেছিলেন, এই ব্যবস্থার ফলে এমন এক ধরনের দ্বন্দ্ব বা বিরোধ তৈরি হয় যা পুঁজিবাদী সমাজের দ্বন্দ্বের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তার ভাষায়:  

পুঁজিবাদীসমাজেবিদ্যমানদ্বন্দ্বগুলোচরমবিরোধিতা, সংঘাতএবংতীব্রশ্রেণিসংগ্রামেরমধ্যদিয়েপ্রকাশপায়*;* এইসমস্যারসমাধানখোদপুঁজিবাদীব্যবস্থারভেতরেসম্ভবনয়*,* বরংকেবলসমাজতান্ত্রিকবিপ্লবেরমাধ্যমেইএরসমাধানহতেপারে।কিন্তুসমাজতান্ত্রিকসমাজেরদ্বন্দ্বেরবিষয়টিএকেবারেইআলাদা*;* এখানেদ্বন্দ্বগুলোসংঘাতময়বাবৈরীনয়এবংসমাজতান্ত্রিকব্যবস্থারমাধ্যমেইনিরবচ্ছিন্নভাবেএগুলোরসমাধানকরাসম্ভব*...”*২২

তাই এখনকার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক শাসন কাঠামো এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাথে মিলে সাধারণ লক্ষ্যগুলো অর্জনে কাজ করবে। মূলত একেই বলা হয় “জনগণের গণতন্ত্র”, যা “বুর্জোয়া গণতন্ত্রের” বিপরীত ধারণা হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে। এটি এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে নীতিনির্ধারণের লক্ষ্য থাকে “মানুষের বাস্তব উদ্বেগকে সত্যিকারে প্রতিফলিত করা, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটানো, কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং আরও ভালো জীবনের প্রত্যাশা পূরণ করা।”২৩ ভিক্টর গাও, চীনের একজন আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ এবং চীনের আটটি গণতান্ত্রিক দলের অন্যতম, চীনা কুওমিনতাং-এর বিপ্লবী কমিটির সদস্য, যিনি চীনা ও পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার তুলনা করেছেন একটি গাড়ির সঙ্গে। তার মতে, চীনা ব্যবস্থায় সেই গাড়ির সব চাকা একই দিকে ঘোরে। অন্য ব্যবস্থাগুলোতে একই গাড়ির চাকা একে অপরের বিপরীত দিকে ঘোরে, “যার ফলে সমন্বয় বা সহযোগিতা এবং বৃহত্তর ফলাফল আসে না, বরং দেখা দেয় অদক্ষতা, অকার্যকারিতা, সাফল্যের ঘাটতি এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য কোনো মৌলিক উপকার নিশ্চিত হয় না।”২৪ একটি অভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার এই প্রয়োজনীয়তা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে: ভোটাররা কেবল কর্মকর্তাদের নির্বাচিতই করেন না, বরং তারা যদি জনগণের স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে না পারেন, তবে তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অধিকারও ভোটাররা রাখেন।২৫ এছাড়া জনগণকে দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করা হয়, এবং এসব অভিযোগের বাস্তব ফলও হয়। ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শুধু দুর্নীতির অভিযোগেই ৪.৭ মিলিয়ন মানুষ বিভিন্ন ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন।২৬ 

চীনের ‘সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র’ (Whole-process people’s democracy) আসলে দুটি বড় গণতান্ত্রিক মডেলের সমন্বয়ে তৈরি: একটি হলো নির্বাচনী গণতন্ত্র এবং অন্যটি হলো পরামর্শমূলক গণতন্ত্র। এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয় একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে, অর্থাৎ টাউনশিপ (乡镇级) পর্যায়ে। এখানে টাউনশিপ পিপলস কংগ্রেস সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়। একই সঙ্গে, সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত স্বশাসিত গ্রাম কমিটি এবং স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনা সভা ও ফোরামের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। তৃণমূল পর্যায়ের এই নির্বাচনগুলোই চীনের গণতন্ত্রের সবচেয়ে ব্যাপক এবং প্রাণবন্ত রূপ। এর মধ্যে শুধু গ্রাম কমিটি বা শহরের আবাসিক কমিটি নির্বাচনই নয়, বরং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থায় কর্মী প্রতিনিধিদের নির্বাচনও অন্তর্ভুক্ত। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীনের শাসনব্যবস্থা এখনো অনেকটাই বিকেন্দ্রীকৃত।প্রাদেশিক, প্রিফেকচার, কাউন্টি, টাউনশিপ ও গ্রাম পর্যায়ের স্থানীয় সরকারগুলোই মোট সরকারি আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ সংগ্রহ করে এবং ব্যয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশের দায়িত্ব পালন করে। চীনের কেন্দ্রীয় সরকার মোট সরকারি ব্যয়ের মাত্র ১৫ শতাংশের দায়িত্ব পালন করে, যেখানে বৈশ্বিক গড় হলো ৬৬ শতাংশ।২৭

কাউন্টি পর্যায়ে (县级) রয়েছে কাউন্টি পিপলস কংগ্রেস, যাদের কাজে সহায়তা করে স্থানীয় CPPCC কমিটিগুলো। এছাড়াও কৃষি, শিল্প, শিক্ষা এবং অন্যান্য খাতের জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সরাসরি গণশুনানির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রিফেকচার বা শহর পর্যায়ে (地市级) রয়েছে মিউনিসিপ্যাল পিপলস কংগ্রেস ও তাদের স্থায়ী কমিটি, মিউনিসিপ্যাল CPPCC কমিটি, খাতভিত্তিক পরামর্শ ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ। প্রদেশ পর্যায়ে (省级) রয়েছে ‘প্রাদেশিক পিপলস কংগ্রেস’ এবং তাদের স্থায়ী কমিটি। এর পাশাপাশি রয়েছে প্রাদেশিক CPPCC কমিটি, বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সমন্বয় সাধনের বিশেষ ব্যবস্থা এবং নামী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোর (গবেষণা সংস্থা) সাথে নীতি-নির্ধারণী পরামর্শ প্রক্রিয়া। টাউনশিপ এবং কাউন্টি স্তরে যখন সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, তখন সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আবার তাদের উপরের স্তরের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন (চিত্র ১ দেখুন)।

চীনের সম্প্রদায় স্তরের স্বশাসন মূলত গণতন্ত্রের পাঁচটি আন্তঃসংযুক্ত মাত্রার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা স্থানীয় স্তরে লোকজনদের অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের এক সামগ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন হলো তৃণমূল স্তরের নির্বাচনী ভিত্তি। গ্রামবাসীদের কমিটি, শহুরে বাসিন্দাদের কমিটি এবং সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের কংগ্রেস সর্বত্র এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শহরতলি ও কাউন্টি স্তরে একইসাথে কমিটির নেতৃত্ব ও সদস্যবৃন্দ নির্বাচিত হন। তারপরে আসে গণতান্ত্রিক পরামর্শ, যেখানে প্রস্তাবনা, সম্মেলন, আলোচনা, সেমিনার, শুনানি, মূল্যায়ন ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম এবং জনমত সমীক্ষা সহ বিবিধ বৈচিত্র্যময় মাধ্যমে লোকেরা নিজেদের স্বার্থ, বিশেষত নির্দিষ্ট গোষ্ঠীদের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করে সমাধান খুঁজে নেন। তৃতীয়টি হল গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যা অনুষ্ঠিত হয় গ্রামবাসী, শহরবাসী ও তাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে মিটিংয়ের মাধ্যমে। এই সব মিটিংয়ে বিভিন্ন আর্থসামাজিক সমস্যা, পরিকাঠামো, সামাজিক ব্যবস্থাপনা, সাংস্কৃতিক পরিষেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্ব-শাসন ব্যবস্থার নিয়মাবলী এবং অন্যান্য গুরুতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এবং স্থানীয় বিষয়ে বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা শহুরে ও গ্রামীণ সম্প্রদায়গুলোকে বাসিন্দাদের অধিকার ও বাধ্যবাধকতা, সাংগঠনিক পদ্ধতি, সমষ্টিগত অর্থনীতির নীতি, পাড়ার নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা, স্যানিটেশন, বিবাহ প্রথা, পরিবার পরিকল্পনা এবং সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ সম্পর্কিত নিজস্ব নিয়মকানুন ও রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা দেয়, যেখানে সম্প্রদায়গুলো সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর অধীনে তাদের নিজস্ব জনকল্যাণমূলক কাজ ও পরিষেবাগুলো পরিচালনা করে। পরিশেষে, গণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধান নাগরিক, আইনগত সত্তা এবং সংস্থাগুলিকে রাষ্ট্রের সংস্থা ও কর্মকর্তাদের কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দেয়, এটি করা হয় প্রশাসনিক পর্যালোচনা অনুরোধ, মামলা এবং তত্ত্বাবধায়ী সংস্থায় অভিযোগের মাধ্যমে, যদি কোনো কর্মকর্তা অসদাচরণ, কর্তব্যে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা পেশাগত নৈতিকতার লঙ্ঘন করে। এর মাধ্যমে এমন জবাবদিহি ব্যবস্থা তৈরি হয় যা তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক শাসনের চক্রকে সম্পূর্ণ করে।২৮ চংকিংয়ের মিনঝু গ্রামকে পরিবর্তিত করার যে বিস্তৃত পরামর্শ প্রক্রিয়া চলে, তাতে এই প্রতিটি স্তরের অংশগ্রহণ প্রতিফলিত হয়েছে।

জাতীয় স্তরে এই প্রক্রিয়াগুলো ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস (NPC) এবং CPPCC-র জাতীয় কমিটির পাশাপাশি স্টেট কাউন্সিলের পরামর্শ প্রক্রিয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নির্ধারণী পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একত্রিত হয়।NPC চীনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্র ক্ষমতার সংস্থা হিসেবে কাজ করে, যার প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করা হয় বহুস্তরীয় পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয় টাউনশিপ পর্যায়ের সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে।২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, NPC-র মোট সদস্য সংখ্যা ২,৯৭৭ জন। এখানে চীনের মোট ৫৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা এথনিক গ্রুপের প্রত্যেকেরই প্রতিনিধি ছিলেন। মোট সদস্যের ১৪.৮৫ শতাংশই হলো এই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধি (চীনের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ সংখ্যালঘু হলেও তাদের প্রতিনিধিত্ব গড়ের তুলনায় অনেক বেশি)। NPC-র মোট সদস্যদের মধ্যে ১৬.৬৯ শতাংশ ছিলেন একদম সামনের সারির শ্রমিক ও কৃষক; যার মধ্যে ৫৬ জন প্রতিনিধি সরাসরি পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্য থেকে এসেছেন। অন্যদিকে, দলীয় এবং সরকারি কর্মকর্তাদের হার ছিল ৩২.৫৫ শতাংশ। মজার ব্যাপার হলো, এই হারটি ধীরে ধীরে কমছে; কারণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় শ্রমিক, কৃষক এবং বিশেষজ্ঞরা এই কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন।২৯ NPC বার্ষিকভাবে মিলিত হয় এবং এর একটি স্থায়ী কমিটি রয়েছে যা অধিবেশনগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে একদম স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত NPC-র পাশাপাশি সমান্তরালভাবে CPPCC-র কার্যক্রম চলে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে চীনের আটটি গণতান্ত্রিক দলের প্রতিনিধিরা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় গোষ্ঠী, হংকং, মাকাও, তাইওয়ান অঞ্চলের প্রতিনিধি, বিদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিক এবং বিভিন্ন খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এটি মূলত একটি পরামর্শমূলক সংস্থা হিসেবে কাজ করে, যার মূল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক সংলাপ এবং সব পক্ষের মধ্যে ঐক্যমত্য তৈরি করা।

প্রতিটি স্তরের এই প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই “মাস লাইন বা জনমুখী ধারা” প্রক্রিয়ার বিবর্তনকে প্রতিফলিত করে, যেখানে ধারণা, নীতি এবং প্রতিবেদনগুলো কমিউনিটি পর্যায় থেকে ধাপে ধাপে জাতীয় স্তরে পৌঁছায় এবং এরপর নীতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় নিচের দিকে প্রয়োগ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাগুলো ক্রমে পরিশীলিত ও শক্তিশালী হয়, যা জনগণের জীবনে অভূতপূর্ব উন্নতি আনতে সাহায্য করেছে। 

চীনে গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণা

চীনের ‘সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র’ (Whole-process people’s democracy) ব্যবস্থার এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ পশ্চিমা শিক্ষাজগতে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, যা চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কর্তৃত্ববাদী অবৈধতার কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে এবং চীনা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মূলত জোরপূর্বক ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হিসাবে উপস্থাপন করে। কিন্তু বাস্তবে চীনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতরে নানা প্রতিষ্ঠান আর প্রথার সমাহার রয়েছে, যা মিলেমিশে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে ক্রমশ আরও বিস্তৃত করছে দেশের শাসন ব্যবস্থায়। 

একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো চীনা জনগণ নিজেরা তাদের গণতান্ত্রিক মডেলকে কীভাবে দেখে, সেই প্রশ্নটি। এক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা উদারপন্থী প্রতিষ্ঠানগুলোসহ বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত গণতন্ত্র সম্পর্কে চীনাদের ধারণার ওপর করা ব্যাপক সমীক্ষার তথ্য থেকে কেবল এটাই জানা যায় না যে, চীনা জনগণ তাদের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলোর কার্যক্রমে বিপুলভাবে সন্তুষ্ট, বরং এটাও জানা যায় যে চীনা জনগণের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের সরকারকে গণতান্ত্রিক এবং জনগণের সেবায় নিয়োজিত বলে মনে করে।

এখানে আমরা বেশ কয়েকটি প্রধান গবেষণার তথ্য তুলে ধরছি। প্রথমে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাশ সেন্টার ফর ডেমোক্র্যাটিক গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনোভেশন চীনা নাগরিকদের সরকারি কার্যকারিতার প্রতি সন্তুষ্টি পরিমাপের সবচেয়ে বিস্তৃত স্বাধীন মূল্যায়ন পরিচালনা করে এসেছে, যা ২০০৩ সাল থেকে সাধারণ মানুষের মনোভাব ট্র্যাক করছে। তাদের ২০২০ সালের রিপোর্টে, “Understanding CCP [sic] Resilience: Surveying Chinese Public Opinion Through Time,” দেখা গেছে যে চীনা সরকারের প্রতি সব স্তরে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। গবেষণার লেখকরা এমন একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছিলেন যা শুরুতে ধরে নিয়েছিল যে চীনের কর্তৃত্ববাদী প্রকৃতি বৈধতার সংকট সৃষ্টি করবে। কিন্তু তারা বরং দেখেছেন যে নাগরিকদের সন্তুষ্টি ক্রমেই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের হার ২০১৬ সালের মধ্যে ৯৩%-এ পৌঁছেছিল, আর প্রাদেশিক সরকারের সমর্থন হার ৮২% বজায় ছিল, যা সময়ের সাথে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল (চিত্র ২ দেখুন)। গুরুত্বপূর্ণভাবে, গবেষণায় দেখা গেছে যে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে সন্তুষ্টির বৃদ্ধি দেখিয়েছে বেশি যা ‘সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র’ (Whole-process people’s democracy)-এর কার্যকারিতা সম্পর্কে চীনা চিন্তাভাবনার সাথে সঙ্গতি রেখে এই ইঙ্গিত দেয় যে, রাষ্ট্রের বস্তুগত প্রয়োজন এবং পরিস্থিতির প্রতি সংবেদনশীলতা তার বৈধতার একটি মূল উপায় হিসেবে কাজ করে।৩০

লেখকরা তাদের ফলাফল সংক্ষেপে এভাবে উপস্থাপন করেছেন: “আমরা দেখেছি যে ২০০৩ সালে সমীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে চীনা নাগরিকদের সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি প্রায় সার্বিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিস্তৃত জাতীয় নীতিমালার প্রভাব থেকে শুরু করে স্থানীয় শহরের কর্মকর্তাদের আচরণ পর্যন্ত, চীনা নাগরিকরা সরকারকে আগের তুলনায় আরও দক্ষ ও কার্যকর মনে করছেন। মজার বিষয় হলো, দরিদ্র, অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি সন্তুষ্টির বৃদ্ধি রিপোর্ট করার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চীনা নাগরিকদের মনোভাব বাস্তব বস্তুগত কল্যাণের পরিবর্তনের প্রতি (ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয়ভাবে) প্রতিক্রিয়া দেখায়।”৩১

এই ফলাফলগুলো এশিয়ান ব্যারোমিটার সার্ভের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ২০১৫ সালে দেখিয়েছিল যে চীনের ৮৭% অংশগ্রহণকারীর জাতীয় সরকারের প্রতি “খুব বেশি” বা “অনেকটা” আস্থা রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যা ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে চীনে ৯০%-এর বেশি মানুষ জাতীয় সরকারের প্রতি “খুব বেশি” বা “অনেকটা” আস্থা প্রকাশ করে। ২০১৮ সালে সর্বশেষ পর্যায়ে আস্থা ছিল ৯৫%, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ স্তরের মধ্যে একটি।  

এই ফলাফলগুলোকে পূরক হিসেবে, অ্যালায়েন্স অফ ডেমোক্রেসিজ (AoD), যা প্রাক্তন ন্যাটো নেতৃত্ব ও ড্যানিশ সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, ২০১৯ সাল থেকে ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্সের/গণতন্ত্র উপলব্ধি সূচকের বাৎসরিক রিপোর্ট প্রকাশ করছে। জার্মান বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাতানার সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে, AoD এমন গবেষণাপদ্ধতি ব্যবহার করে যা উত্তরদাতাদের পক্ষপাত ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত সমস্যাগুলো কমানোর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা।২০২৪ সালের ফলাফলগুলো দেখায় যে, চীনের ৯২% উত্তরদাতা গণতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, ৭৯% তাদের দেশকে গণতান্ত্রিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ৯১ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে তাদের সরকার কোনো বিশেষ প্রভাবশালী বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির স্বার্থে নয়, বরং সাধারণ মানুষের স্বার্থে কাজ করে, এই প্রতিটি পরিসংখ্যান বিশ্বের প্রায় অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি ছিল এবং উদারপন্থী গণতন্ত্রের প্রতীক হিসাবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের উত্তরদাতাদের তুলনায় প্রতিটি সূচকেই অনেক এগিয়ে ছিল (চিত্র ৩ দেখুন)।৩২  

AoD স্টাডিতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তাদের ধারণাও যাচাই করা হয়েছে। এখানেও দেখা গেছে, চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের চেয়ে এগিয়ে। যখন এটি বলা হয়েছিল যে, “আমার দেশের প্রত্যেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে”, তখন চীনের মাত্র ১৮% মানুষ এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেছে (যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ছিল ২৭%)। এবং যখন এই বিবৃতিটি দেওয়া হয়েছিল যে, “আমার দেশের রাজনৈতিক নেতারা মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন” তখন চীনের মাত্র ৫% মানুষ এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেছে (যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ছিল ২৭%)। 

সবশেষে, পলিটিক্যালসাইকোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় ৪২টি দেশের মানুষের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা কি মনে করে তাদের সমাজব্যবস্থা ন্যায্য ও সঠিক।৩৩ তারা নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো ব্যবহার করেন: “সামগ্রিকভাবে আমি সমাজটাকে ন্যায়সঙ্গত মনে করি”, “সাধারণভাবে আমার দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেমন হওয়া উচিত, তেমনভাবেই চলছে”, “আমাদের দেশে প্রত্যেকেরই উন্নতি করার আর সুখে থাকার সমান সুযোগ আছে”, এবং “আমাদের সমাজব্যবস্থা এমনভাবেই তৈরি যেখানে মানুষ সাধারণত তার যোগ্য পাওনাটাই পায়”। ফলাফলে দেখা যায় যে, বেশিরভাগ দেশেই গড় উত্তর ছিল হয় “কিছুটা অসম্মত”, নয়তো “নিরপেক্ষ”। শুধুমাত্র একটি দেশ আছে যেখানে গড় উত্তর “কিছুটা একমত”-এর পর্যায়ে রয়েছে, এবং সেটি হলো চীন। অর্থাৎ, এই তালিকায় থাকা অন্য সব দেশের তুলনায় চীনের মানুষই সবচেয়ে বেশি মনে করে যে তাদের সমাজব্যবস্থা ন্যায্য ও সুবিচারপূর্ণ। 

এই ফলাফলগুলো সত্যিই চমকপ্রদ। কিছু সংশয়বাদী এই তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এই বলে যে, যদি উত্তরদাতারা এমন একটি ব্যবস্থায় বাস করেন যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের জন্য দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তারা তাদের সরকারের প্রতি সমর্থনকে অতিরঞ্জিত করে বলতে পারেন। এই বিষয়টাকেই বলা হয় ‘কৌশলগত ভুল রিপোর্ট’। কিন্তু রাজনৈতিক দমন-পীড়নের জন্য পরিচিত দেশগুলোতে এই সমস্ত গবেষণায় কম স্কোর পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে এটি কোনো বাস্তব সমস্যা নয়। যাই হোক, চীন সংক্রান্ত বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণায় এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই বিশদ আলোচনা হয়ে আসছে। গবেষকরা কৌশলগত ভুল রিপোর্ট বাদ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা পদ্ধতি ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি গবেষণা চালিয়েছেন, যেমন তালিকা পরীক্ষা এবং অন্তর্নিহিত সংযোগ পরীক্ষা। বারবার এই গবেষণাগুলো নিশ্চিত করেছে যে, চীনের জনগণের তাদের সরকার এবং তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সত্যিই উচ্চ স্তরের সমর্থন রয়েছে।৩৪ 

এই বাস্তবভিত্তিক অনুসন্ধানগুলো রাজনৈতিক বৈধতা মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত উদারনৈতিক বিশ্লেষণমূলক কাঠামোকে একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। একাধিক স্বাধীন গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে পাওয়া উচ্চ সমর্থনের হার ইঙ্গিত দেয় যে, রাজনৈতিক বৈধতা কেবল প্রক্রিয়াগত গণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে আসে না; বরং তা আসে সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রা ও বস্তুগত প্রয়োজনের প্রতি কতটা কার্যকর সাড়া দেওয়া হচ্ছে, সেখান থেকে। এই পর্যবেক্ষণটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বিশ্লেষণের সঙ্গেও মিলে যায়, যেখানে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা, জনগণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

গত দুই দশকের দিকে তাকালে দেখা যায়, চীনের উৎপাদন শিল্পে শ্রমিকদের মজুরি প্রায় আট গুণ বেড়েছে। একটা সময় এশিয়ায় চীনের মজুরি ছিল সবথেকে কম, অথচ এখন তা এই অঞ্চলের যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে চীনের গড় আয়ু এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের। এমনকি GBDS-এর তথ্য অনুযায়ী, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মেয়াদে চীন এখন আমেরিকার চেয়েও চার বছর এগিয়ে।৩৫ এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উন্নয়ন এবং এর তাৎপর্য চীনা জনগণের কাছে অজানা নয়।

আমরা উপরে উল্লেখ করেছি যে, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই গণতান্ত্রিক নীতিগুলোকে উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে দেওয়া। আমাদের এই আলোচনার মূল বিষয় হলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, তাই চীনের অর্থনীতিতে ঠিক কতটা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা এই লেখার পরিসরের বাইরে। তবে এটি সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে, এমনকি চীনের ভেতরেও এই বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। একদিকে, আর্থিক খাত এবং অর্থনীতির মূল স্তম্ভগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকার ফলে (চীনের GDP-র প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো থেকে), চীন তার বিনিয়োগ আর উৎপাদনকে গণতান্ত্রিকভাবে অনুমোদিত জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারে।অন্যদিকে, বামপন্থী সমালোচকরা উল্লেখ করেন যে, অনেক চীনা শ্রমিকের শ্রমপ্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এখনো পুঁজিবাদী সংস্থাগুলোর অধীনে শোষণমূলক রয়ে গেছে।  

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, CPC সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরে আরও বেশি করে শ্রমিক-গণতন্ত্র গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক কিছু নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে, যেসব সংস্থায় তিনজন বা তার বেশি CPC সদস্য কাজ করেন, সেখানে কোম্পানির প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ওই কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আগামী দশকগুলোতে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রশ্নে CPC কোন পথে এগোয়, সেটা আরও পরিষ্কার হবে। তবে চীনের মানুষের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা থেকে যেটা স্পষ্ট, তা হলো, ২০১২ সালের পর থেকে, আর বিশেষ করে ২০১৭ সালে ১৯তম ন্যাশনাল কংগ্রেসের পর, সরকার সমাজতন্ত্রের পথে নিজেদের যাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে; ২০৪৯ সালের মধ্যে একটি ‘সমৃদ্ধ, শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক, সংস্কৃতিবান এবং শান্তিপূর্ণ আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশ’ গড়ে তোলা এখন চীনের সরকারি লক্ষ্য। এগুলো নিছক স্লোগান নয়, বরং স্পষ্ট সাফল্যের মানদণ্ডসহ নানা বাস্তব ও নির্দিষ্ট নীতিগত ক্ষেত্রের প্রতিফলন। উদাহরণ হিসেবে দারিদ্র্য বিমোচনের বিশেষ কর্মসূচীটির কথা বলা যেতে পারে যার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল চীনের গ্রামাঞ্চল জুড়ে ‘সমবায় ভিত্তিক অর্থনীতি’ বা কো-অপারেটিভ ইকোনমি গড়ে তোলা।

সংক্ষেপে, চীনের ঘটনাটি দেখায় যে কীভাবে বিকল্প গণতান্ত্রিক কাঠামো, যা চীনে ‘সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র’ (Whole-process people’s democracy)’ হিসেবে পরিচিত, উদারনৈতিক গণতন্ত্রে প্রশংসিত পথগুলোর চেয়ে ভিন্ন পথে বৈধতা অর্জন করতে পারে। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীয়করণের নীতি, যখন নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় জনসাধারণের প্রতিষ্ঠিত অংশগ্রহণের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন এমন প্রক্রিয়া তৈরি হয় যা সরকারের কার্যকর প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করে, যা শুধুমাত্র নির্বাচনী চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যেমনটা পুঁজিবাদী সমাজে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা হয়ে থাকে।

উপসংহার

মিনঝু গ্রামের পরিবর্তন, যা চীনের হাজার হাজার উদাহরণের একটি, স্পষ্টভাবে দেখায় কীভাবে “সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র ’ (Whole-process people’s democracy)” চীনের ১৪ কোটি মানুষের জন্য বাস্তবে কাজ করে। শত শত আঙ্গিনার বৈঠক, বাসিন্দাদের মতামত নেওয়ার জন্য ডিজিটাল ডাকবাক্স, আর গ্রামের পুনর্গঠনে নির্দেশনা দেওয়া বিস্তৃত পরামর্শ প্রক্রিয়া, এসব চীনের সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের বড় কাঠামোর ছোট একটি প্রতিচ্ছবি, যা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের বিপ্লবী অভিজ্ঞতা এবং কর্মপদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, এটি গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বৈধতার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সেই দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল ধারণাগুলোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। একইসঙ্গে এটি সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বকেও তুলে ধরে যেখানে জোর দেওয়া হয় কেবল রাজনৈতিক অধিকারের ওপর নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ওপরেও।

চীনা মডেলটি প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রকে পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া বা বস্তুগত পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিগত অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। ‘সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র’ (Whole-process people’s democracy) আসলে নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমগুলোকে শাসনের প্রতিটি স্তরে একসূত্রে গেঁথে দেয়, গ্রাম কমিটি থেকে শুরু করে NPC পর্যন্ত, যা নীতিনির্ধারণের প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন পথ বা মাধ্যম তৈরি করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক বৈধতা নির্ভর করে মানুষের জীবনযাত্রা আর সামাজিক অবস্থার বাস্তব উন্নতির ওপর, যেমন চরম দারিদ্র্যের অবসান, ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, আর জীবনমানের ধারাবাহিক উন্নতি, যা সবই এমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, যেখানে নীতিনির্ধারণে নিয়মিতভাবে জনগণের মতামত ও নজরদারি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গণতন্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি ক্রমবর্ধমান ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিটিই আসলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী এবং উদারনৈতিক পদ্ধতির মধ্যকার বিশাল পার্থক্যকে স্পষ্ট করে দেয়। উদারনৈতিক গণতন্ত্র যেখানে পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকেই গণতন্ত্রের শেষ সীমা বলে মনে করে, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র সেখানে মনে করে যে মানুষের বৈষয়িক অবস্থা এবং চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক চর্চাও ক্রমাগত বিবর্তিত হওয়া উচিত। লিন শাংলি যেমনটা যুক্তি দিয়েছেন যে, গণতন্ত্র আর উন্নয়নের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে: “গণতন্ত্র যেমন আধুনিকায়নের একটি পূর্বশর্ত, তেমনই এটি আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যও বটে; এটি অগ্রগতির হাতিয়ার হিসেবে যেমন কাজ করে, তেমনই আধুনিকায়নের পথে এটি নিজেই একটি গন্তব্য।”৩৬ চীনের এই অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে, এই দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে কাঠামোর চেয়ে বিষয়বস্তুকে, আর প্রক্রিয়ার চেয়ে বাস্তব ফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেই সব ব্যবস্থার তুলনায় প্রকৃত জনসার্বভৌমত্বের আরও শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, যেগুলো রাজনৈতিক সমতা কাগজে–কলমে নিশ্চিত করলেও বাস্তবে বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য মেনে নেয়, যা মানুষের অর্থবহ গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে ক্ষুণ্ন করে।

আরও গভীরভাবে দেখলে, চীনের অভিজ্ঞতা দেখায় যে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ আর গণতন্ত্র, এই দুটো আলাদা কিছু নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ভিক্টর গাও যেমন বলেছেন:

যদিকেউমনেকরেযেগণতন্ত্রছাড়াই, সিদ্ধান্তগ্রহণেরপ্রক্রিয়ায়চীনাজনগণেরসক্রিয়অংশগ্রহণছাড়াইগতচারদশকেচীনগভীরওব্যাপকঅর্থনৈতিকরূপান্তরঘটাতেপেরেছে*,* চরমদারিদ্র্যপুরোপুরিদূরকরেছে*,* বিশ্বেরসবচেয়েবেশিইন্টারনেটওস্মার্টফোনব্যবহারকারীতৈরিকরেছে*,* আরপ্রতিবছর১৫০মিলিয়নেরবেশিমানুষকেবিদেশভ্রমণেপাঠাচ্ছে*,* তাহলেতারবিশ্লেষণআরউপসংহারেনিশ্চয়ইকোথাওবড়ভুলআছে।৩৭

এর প্রভাব কেবল চীনের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এমন এক সময়ে, যখন পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্র বৈধতার সংকটে জর্জরিত যেমন, ভোটারদের অংশগ্রহণ কমছে, বৈষম্য বাড়ছে, প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা প্রবল হচ্ছে এবং অনেক রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বিস্তারের নেশায় মত্ত হয়ে নিজেদেরই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোকে বিসর্জন দিচ্ছে তখন চীনা মডেলটি জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব এবং কার্যকর শাসনের মধ্যে সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার বিকল্প পথ দেখায়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পরীক্ষা কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সাথে সঙ্গতি রক্ষায় নিহিত নয়, বরং জনগণের জীবন ও সমাজের পরিস্থিতি গঠনে তাদের সক্রিয় করার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত। সুতরাং, ‘সর্বাঙ্গীণ জনগণের গণতন্ত্র’ (Whole-process people’s democracy) বোঝার জন্য উদারনৈতিক মতাদর্শের আরোপিত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে রাজনৈতিক সংগঠনের সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতির সাথে গুরুত্ব সহকারে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন, যা একবিংশ শতাব্দীতে উন্নয়ন এবং জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নিয়ে সংগ্রামরত সকল সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

তথ্যসূত্র 

০১

এখানে প্রদত্ত তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়েছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মিনঝু গ্রামে এক সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে। এই পরিদর্শনটি অনুষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার কেন্দ্রীয় কমিটির ইনস্টিটিউট অফ পার্টি হিস্ট্রি অ্যান্ড লিটারেচার এবং রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশনের বেইজিং অফিসের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত “আধুনিকায়ন ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব” শীর্ষক আন্তর্জাতিক কর্মশালার প্রেক্ষাপটে। এই নিবন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাইকরণে সহযোগিতার জন্য লেখকগণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং ইয়ান টুরোভস্কি ও ওয়াং জুনইয়ান-এর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। 

০২

জি, সিউং এবং টিংস চাক, "রিভাইভিং এরহাই লেক: অ্যা সোশ্যালিস্ট অ্যাপ্রোচ টু ব্যালেন্সিং হিউম্যান অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট," ওয়েনহুয়া জংহেং: অ্যা জার্নাল অফ কনটেম্পোরারি চাইনিজ থট ২, সংখ্যা ২ (ডিসেম্বর ২০২৪)।

০৩

লেনিন, ভ্লাদিমির ইলিচ। দ্য স্টেট অ্যান্ড রেভল্যুশন। মস্কো: প্রগ্রেস পাবলিশার্স, ১৯১৭।

০৪

গিলেন্স, মার্টিন এবং বেঞ্জামিন আই. পেজ। “টেস্টিং থিওরিজ অব আমেরিকান পলিটিক্স: এলিটস, ইন্টারেস্ট গ্রুপস, অ্যান্ড অ্যাভারেজ সিটিজেনস।” পার্সপেকটিভস অন পলিটিক্স ১২, সংখ্যা ৩ (২০১৪): ৫৬৪–৫৮১।

০৫

অ্যালায়েন্স অব ডেমোক্র্যাসিস ফাউন্ডেশন। ডেমক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৪। কোপেনহেগেন: অ্যালায়েন্স অব ডেমোক্র্যাসিস ফাউন্ডেশন, ২০২৪। 

০৬

রাসমুসেন, ম্যাগনাস এবং নুটসেন, কার্ল। “রিফর্মিং টু সারভাইভ: দ্য বলশেভিক অরিজিনস অফ সোশ্যাল পলিসিস”। এলিমেন্টস ইন পলিটিক্যাল ইকোনমি, ২০২১। 

০৭

মাও সেতুং পার্টি ও তার শত্রুদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আর জনগণের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছিলেন। প্রথমটি হলো শত্রুভাবাপন্ন দ্বন্দ্ব, যা নিরসনের জন্য কঠোর বা দমনমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, জনগণের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বগুলো যা শত্রুভাবাপন্ন নয়; এগুলো আলাপ-আলোচনা এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান করা সম্ভব। এটি 'সর্বহারার একনায়কতন্ত্র' বা প্রলেতারিয়েতের ডিক্টেটরশিপের সেই মূল নীতিকেই প্রতিফলিত করে যেখানে বলা হয় “জনগণের জন্য গণতন্ত্র এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের ওপর একনায়কত্ব”। দেখুন মাও সেতুং এর “অন দ্য কারেক্ট হ্যান্ডলিং অব কনট্রাডিকশনস অ্যামং দ্য পিপল”।

০৮

মার্ক্স, কার্ল এবং এঙ্গেলস, ফ্রিডরিখ। দ্য জার্মান আইডিওলজি। ১৮৪৫। 

০৯

মাও সেতুং এর “সাম কোয়েসচনস কনসারনিং মেথডস অফ লিডারশিপ”।

১০

চীনা পন্ডিতদের লেখায় শি জিনপিং বা CPC-র পূর্বতন নেতাদের উদ্ধৃতির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। এটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, পশ্চিমা বিশ্বে যেমনটা ধারণা করা হয়, এটি নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের প্রতিফলন নয়। চীনে পার্টি নেতৃত্বের বক্তব্য ও লেখাগুলোকে কর্তৃত্বপূর্ণ মনে করা হয়, কারণ সেগুলো এই লেখায় বর্ণিত বিস্তৃত পরামর্শ ও সংলাপের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। অন্যভাবে বললে, এগুলো চীনা সমাজের ভেতরে গড়ে ওঠা সর্বোচ্চ স্তরের ঐকমত্যকে তুলে ধরে। সে কারণেই এগুলোর তাত্ত্বিক ও বাস্তব গুরুত্ব আছে, যা পশ্চিমা নেতাদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায় না। 

১১

শি জিনপিং, “ব্রড, মাল্টিলেভেল, অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনালাইজড কনসালটেটিভ ডেমোক্র্যাসি”, দ্য গভর্ন্যান্স অব চায়না II।

১২

মাও সেতুং, “সাম কোয়েশ্চেন কনসার্নিং মেথডস অব লিডারশিপ”

১৩

উইলিয়াম হিন্টন রচিত ফ্যানশেন: আ ডকুমেন্টারি অব রেভল্যুশন ইন আ চাইনিজ ভিলেজ, নিউ ইয়র্ক: ভিন্টেজ বুকস, ১৯৬৬, পৃ. ৬০৯।

১৪

জু লি, “আ নিউ টাইপ অব পলিটিক্যাল পার্টি সিস্টেম দ্যাট হ্যাজ গ্রোন আউট অব চাইনিজ সয়েল”, কিউশি জার্নাল।

১৫

লিন শাংলি, “ডেভেলপিং হোল-প্রসেস পিপলস ডেমোক্র্যাসি টু অ্যাডভান্স চাইনিজ মডার্নাইজেশন”, কিউশি জার্নাল।

১৬

শি জিনপিং, “ব্রড, মাল্টিলেভেল, অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনালাইজড কনসালটেটিভ ডেমোক্র্যাসি”, দ্য গভর্ন্যান্স অব চায়না II।

১৭

চেং এনফু এবং চেন জিয়ান, “দ্য সিগনিফিকেন্স অফ চায়নাস ফুলফিলমেন্ট অফ ইটস সেকেন্ড সেন্টিনারি গোল বাই ২০৪৯”, পিপলস চায়না অ্যাট ৭৫ - দ্য ফ্ল্যাগ স্টেজ রেড, লন্ডন: প্র্যাক্সিস প্রেস, ২০২৪, পৃ. ৪৫।

১৮

আইবিড।

১৯

প্রেস অফিস, CPC কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগ। হোল-প্রসেস পিপলস ডেমোক্র্যাসি বিষয়ক বিশেষ সংখ্যা, পৃ. ৩। 

২০

রামোস, মাউরো রচিত “চাইনিজ পিপল সাবমিট ওভার ৩ মিলিয়ন সাজেশনস ফর গভর্নমেন্টস ১৫থ ফাইভ-ইয়ার প্ল্যান”, পিপলস ডিসপ্যাচ, ৭ আগস্ট, ২০২৫। 

২১

推动中华民族伟大复兴号巨轮乘风破浪、扬帆远航——党的二十大报告诞生记

২২

মাও সেতুং, এর “অন দ্য কারেক্ট হ্যান্ডলিং অব কনট্রাডিকশনস অ্যামং দ্য পিপল”।

২৩

লিন শাংলি, “ডেভেলপিং হোল-প্রসেস পিপল’স ডেমোক্র্যাসি টু অ্যাডভান্স চাইনিজ মডার্নাইজেশন”, কিউশি জার্নাল।

২৪

“হাউ ডাজ হোল-প্রসেস পিপল’স ডেমোক্র্যাসি ওয়ার্ক?”, CGTN, ৭ নভেম্বর ২০২২। 

২৫

অধ্যায় ৯: তত্ত্বাবধান, প্রত্যাহার এবং শূন্য পদ পূরণের জন্য উপনির্বাচন, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জাতীয় গণকংগ্রেস ও স্থানীয় গণকংগ্রেসসমূহের নির্বাচনী আইন।

২৬

ঝাং হুই, “চায়না পানিশেস ৪.৭ মিলিয়ন পিপল ইন ডেকেড-লং অ্যান্টি-গ্রাফট ক্যাম্পেইন”, গ্লোবাল টাইমস। 

২৭

আর্থার ক্রোয়েবার, চায়নাজ ইকোনমি: হোয়াট এভরিওয়ান নিডস টু নো (নিউ ইয়র্ক: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২০), পৃ. ১৪৭।

২৮

“চায়না: ডেমোক্র্যাসি দ্যাট ওয়ার্কস”, স্টেট কাউন্সিল ইনফরমেশন অফিস, ৪ ডিসেম্বর ২০২১। 

২৯

【两会知识贴④】全国人大代表都是谁?গুয়াংমিং ডেইলি, ৪ মার্চ ২০২৩। 

৩০

কানিংহ্যাম, এডওয়ার্ড; সাইচ, টনি; এবং টুরিয়েল, জেসি। “আন্ডারস্ট্যান্ডিং CCP রেজিলিয়েন্স: সার্ভেয়িং চাইনিজ পাবলিক ওপিনিয়ন থ্রু টাইম”। অ্যাশ সেন্টার ফর ডেমোক্র্যাটিক গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনোভেশন, হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল, ২০২০।

৩১

আইবিড।

৩২

অ্যালায়েন্স অব ডেমোক্র্যাসিজ ফাউন্ডেশন, “ডেমোক্রেসি পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৪”।

৩৩

ইভান এ. ভ্যালডেস, জেমস এইচ. লিউ, ম্যাট উইলিয়ামস, স্টুয়ার্ট সি. কার, “এ ক্রস-কালচারাল টেস্ট অব কমপিটিং হাইপোথিসিস অ্যাবাউট সিস্টেম জাস্টিফিকেশন ইউজিং ডাটা ফ্রম ৪২ নেশনস”, পলিটিক্যাল সাইকোলজি, ভলিউম ৪৬, ইস্যু ৪: ৮২২–৮৪৬।

৩৪

এই সাহিত্য বিষয়ে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার জন্য দেখুন: জেসন হিকেল, “সাপোর্ট ফর গভর্নমেন্ট ইন চায়না: ইজ দ্য ডাটা অ্যাকিউরেট?”।

৩৫

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডি

৩৬

লিন শাংলি, “ডেভেলপিং হোল-প্রসেস পিপল’স ডেমোক্র্যাসি টু অ্যাডভান্স চাইনিজ মডার্নাইজেশন”, কিউশি জার্নাল।

৩৭

“হাউ ডাজ হোল-প্রসেস পিপল’স ডেমোক্র্যাসি ওয়ার্ক?”, CGTN, ৭ নভেম্বর ২০২২।

References

01
The information here was collected during a site visit to Minzhu Village in September 2024 at the sidelines of the International Workshop on Modernization and the Responsibility of Political Parties co-hosted by the Institute of Party History and Literature of the Communist Party of China Central Committee and the Beijing office of the Rosa Luxemburg Foundation. The authors would like to express their gratitude to these institutions, as well as Jan Turowski and Wang Junyan for their support in gathering and verifying materials for this piece.
02
Jie, Xiong and Tings Chak, "Reviving Erhai Lake: A Socialist Approach to Balancing Human and Ecological Development," Wenhua Zongheng: A Journal of Contemporary Chinese Thought 2, no. 2 (December 2024).Source
03
Lenin, Vladimir I. The State and Revolution. Moscow: Progress Publishers, 1917.
04
Gilens, Martin and Benjamin I. Page. "Testing Theories of American Politics: Elites, Interest Groups, and Average Citizens." Perspectives on Politics 12, no. 3 (2014): 564-581.
05
Alliance of Democracies Foundation. "Democracy Perception Index 2024." Copenhagen: Alliance of Democracies Foundation, 2024.
06
Rasmussen, Magnus and Knutsen, Carl. “Reforming to Survive: The Bolshevik Origins of Social Policies.” Elements in Political Economy 2021. Source
07
Mao Zedong distinguished between contradictions between the Party and its enemies, and contradictions among the people. The former are necessarily antagonistic, and may require coercive measures. The latter are non-contradictory and require a democratic approach grounded in dialogue and consultation. This reflects the principle that, under a dictatorship of the proletariat, the state implements “democracy for the people and dictatorship over the reactionaries”. See Mao Zedong, “On the Correct Handling of Contradictions Among the People”.Source
08
Marx, Karl and Engels, Friedrich. The German Ideology. 1845. Source
09
Mao Zedong, “Some Questions Concerning Methods of Leadership”.Source
10
Chinese scholarship tends to rely heavily on quotations from Xi Jinping and earlier leaders of the CPC. It is important to note that this does not reflect, as is assumed in the West, a blind subservience to leadership. The speeches and writings of the party leadership in China are authoritative because they reflect the extensive processes of consultation and dialogue that are laid out in this essay. In other words, they represent the highest level of consensus within Chinese society and therefore carry both theoretical and empirical weight in ways that the speeches of Western leaders do not.
11
Xi Jinping, “Broad, Multilevel, and Institutionalized Consultative Democracy”, The Governance of China II.
12
Mao Zedong, “Some Questions Concerning Methods of Leadership”
13
William Hinton, Fanshen: A Documentary of Revolution in a Chinese Village, New York: Vintage Books, 1966, p. 609.
14
Ju Li, “A New Type of Political Party System That Has Grown Out of Chinese Soil”, Qiushi JournalSource
15
Lin Shangli, “Developing Whole-Process People’s Democracy to Advance Chinese Modernization”, Qiushi Journal.Source
16
Xi Jinping, “Broad, Multilevel, and Institutionalized Consultative Democracy”, The Governance of China II.
17
Cheng Enfu and Chen Jian, “The significance of China’s fulfilment of its Second Centenary Goal by 2049”, People’s China at 75 — The Flag Stays Red, London: Praxis Press, 2024. p. 45.
18
Ibid.
19
The Press Office, International Department of the CPC Central Committee, Special Issue On Whole-Process People’s Democracy, p. 3. Source
20
Ramos, Mauro. “Chinese people submit over 3 million suggestions for government’s 15th Five-year plan”, Peoples Dispatch, August 7, 2025. Source
21
推动中华民族伟大复兴号巨轮乘风破浪、扬帆远航——党的二十大报告诞生记Source
22
Mao Zedong, “On the Correct Handling of Contradictions Among the People”.
23
Lin Shangli, “Developing Whole-Process People’s Democracy to Advance Chinese Modernization”, Qiushi Journal.Source
24
"How does whole-process people's democracy work?" CGTN, November 7, 2022. Source
25
Chapter IX: Supervision, Recall and By-Elections Held to Fill Vacancies, Electoral Law of the National People's Congress and Local People's Congresses of the People's Republic of China.Source
26
Zhang Hui, “China punishes 4.7 million people in decade-long anti-graft campaign”, Global Times. Source
27
Arthur Kroeber, China’s Economy: What Everyone Needs to Know (New York: Oxford University Press, 2020), 147
28
“China: Democracy That Works”, State Council Information Office, December 4, 2021. Source
29
【两会知识贴④】全国人大代表都是谁?Guangming Daily, March 4, 2023. Source
30
Cunningham, Edward, Saich, Tony and Turiel, Jesse. "Understanding CCP Resilience: Surveying Chinese Public Opinion Through Time." Ash Center for Democratic Governance and Innovation, Harvard Kennedy School, 2020.
31
Ibid.
32
Alliance of Democracies Foundation. "Democracy Perception Index 2024."
33
Evan A. Valdes, James H. Liu, Matt Williams, Stuart C. Carr, “A cross-cultural test of competing hypotheses about system justification using data from 42 nations”, Political Psychology, Volume 46, Issue 4: 822-846.
34
For a brief review of this literature, see: Jason Hickel, “Support for government in China: is the data accurate?”Source
35
Global Burden of Disease Study
36
Lin Shangli, “Developing Whole-Process People’s Democracy to Advance Chinese Modernization”, Qiushi Journal.Source
37
"How does whole-process people's democracy work?" CGTN, November 7, 2022.
Available in
EnglishSpanishPortuguese (Brazil)GermanFrenchItalian (Standard)ArabicHindiBengaliRussian
Authors
Paweł Wargan and Jason Hickel
Translators
Santanu Kumar Ghosh and ProZ Pro Bono
Published
10.11.2025
Download ↧
SocialismDemocracy
Progressive
International
Privacy PolicyManage CookiesContribution SettingsJobs
Site and identity: Common Knowledge & Robbie Blundell